চট্টগ্রামের চিকিৎসা জগতে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁদের অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক ডা. এল. এ. কাদেরী। হাটহাজারী উপজেলার ফটিকা গ্রামের গর্ব, প্রয়াত বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ, মুসলমান ইতিহাসে স্মরণীয় মনীষী মরহুম আবদুল লতিফ উকিলের প্রথম সন্তান তিনি। জন্ম ১৯৪২ সালের ২রা অক্টোবর। অতি অল্প বয়সেই তিনি মেধা, অধ্যবসায় ও সততার পরিচয় দেন।
শিক্ষাজীবনের প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন অনন্য। ১৯৫৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করা তাঁর উজ্জ্বল মেধার সাক্ষ্য বহন করে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে গমন করেন। ১৯৬৮ সালে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেনেরিউলজিতে বিশেষায়িত ডিগ্রি এবং ১৯৭১ সালে এডিনবরার খ্যাতনামা ইনস্টিটিউট থেকে এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
দেশে ফিরে তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যোগদানের পর তিনি প্রথমবারের মতো নিউরোসার্জারি বিভাগ চালু করেন। শুধু চালুই নয়, বরং তা সুসংগঠিত করে দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন। তিনি দীর্ঘদিন উক্ত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও রোগীর আস্থা অর্জন করেন।
অধ্যাপক ডা. কাদেরী শুধু একজন চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন গবেষক, সংগঠক এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সমাজকর্মী। তিনি ব্রিটিশ সোসাইটি অব নিউরোসার্জনের সদস্য ছিলেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সাক্ষ্য বহন করে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিএমএ শাখার সভাপতি হিসেবে চিকিৎসকদের পেশাগত কল্যাণে কাজ করেছেন। ১৯৭৯ সালে ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ প্রাক্তন ছাত্রসমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে তিনি সংগঠন গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেন।তাঁর সামাজিক ও মানবিক কাজের বিস্তার ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি মানবকল্যাণে কাজ করেছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে তাঁর আন্তরিকতা ছিল প্রশংসনীয়।
২০২১ সালের ২৯ আগস্ট অধ্যাপক ডা. এল এ কাদেরী পরলোকগমন করেন। বাংলাদেশের চিকিৎসা জগৎ, বিশেষত চট্টগ্রাম, হারায় এক নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, এক দূরদর্শী সংগঠক এবং এক মানবিক মানুষকে।
২০২৫ সালে তাঁর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। তাঁর জীবনের কর্মস্পৃহা, সততা ও মানবসেবার চেতনা আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক: পরিচালক ও সম্পাদক, ইতিহাসের পাঠশালা,চট্টগ্রাম, সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, বাংলাদেশ।