মোঃ শহিদুল ইসলাম
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন এবং র্যাব সদস্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বড় পরিসরের যৌথ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পরিচালিত এ অভিযানে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করে পরিচালিত এই অভিযানকে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম বড় সমন্বিত অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (৯ মার্চ) ভোরে শুরু হওয়া এ অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা পাহাড়ঘেরা জঙ্গল সলিমপুর, আলিনগর ও ছিন্নমূল এলাকার বিভিন্ন স্থানে একযোগে তল্লাশি চালাচ্ছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং অবৈধ বসতিগুলো ঘিরে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযান চলাকালে সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক বা গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
অভিযানে অংশ নেওয়া বাহিনীগুলোর মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রায় ৫৫০ সদস্য, পুলিশের প্রায় ১৮০০ সদস্য, র্যাবের ৪০০ সদস্য, বিজিবির ১২০ সদস্য এবং এপিবিএনের প্রায় ৩০০ সদস্য অংশ নিয়েছেন। নিরাপত্তা তল্লাশি জোরদার করতে ড্রোন ও প্রশিক্ষিত কুকুরের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। আকাশপথে নজরদারির জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে, যা চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তুলনামূলক বিরল ঘটনা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযানের স্বার্থে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সব প্রবেশ ও বাহিরের পথ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পাহাড়ি পথ ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম পাহাড়ি বসতি ও সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করছে।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা অবৈধ পাহাড় দখল, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, প্লট বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি বনভূমিতে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত বসতির কারণে অনেক সময় এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ঘটনার পর থেকেই প্রশাসন এলাকাটিকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং সন্ত্রাসীদের আস্তানা ধ্বংস করাই এই অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, অভিযানের ধারাবাহিকতায় জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্থায়ী নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে এলাকাটিতে স্থায়ীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী গোষ্ঠী যেন এখানে ঘাঁটি গড়ে তুলতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, বহু বছর ধরে পাহাড় দখল করে গড়ে ওঠা বসতি ও অপরাধী চক্রের কারণে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান এই অভিযান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকতে পারে। অভিযান শেষ হওয়ার পর বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।