বাকলিয়া আর বলিরহাটের সীমানা ঘেঁষে বয়ে চলা হাওয়াতে তখন এক অদ্ভুত ভারিক্কি আমেজ ছিলো। বাকলিয়া কালচারাল ও সাইবার মনিটরিং সেন্টারের ওএলইডি ডিসপ্লেতে একের পর এক দেশের বিভিন্ন সংবাদ পোর্টালের ব্রেকিং নিউজ আপডেট ভেসে উঠছিলো।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিলো দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের শিরোনাম:
"কুমিল্লায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক পরিণতি"
"কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোকের ছায়া"
"হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে কুবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ঘাতকদের ফাঁসির দাবি"
খবরগুলোর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে নিজের আল্ট্রাবুক ল্যাপটপে স্মার্ট ভয়েস-টু-টেক্সট ফিচার চালু করলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও কবি অভিলাষ মাহমুদ। মুখের স্পষ্ট উচ্চারণ আর কবিসুলভ সাবলীল শব্দগুলো মুহূর্তেই ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল ডিভাইসের নোটপ্যাডে দ্রুত টাইপ হয়ে স্ক্রিনে ফুটে উঠছিলো। পাশে বসে ল্যাপটপের ভার্চয়াল ফিড বিশ্লেষণ করছিলেন নিউরোলজিস্ট ড. নীলিমা তাপসী এবং ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ও মিডিয়া ডাটা কাভার করছিলেন সাংবাদিক জুলিয়া মুন। টেবিলের এক কোণে বসে হাত দুটো শক্ত করে ধরে ছিলেন স্থানীয় নামী স্কুলের প্রিন্সিপাল বিবি শাহীজান।
"ঘটনাটা মোটেও সাধারণ কোনো ছিনতাই বা অবহেলা নয়, অভিলাষ," ডিজিটাল নিউজ পোর্টালের টেক্সট ডাটা এনালাইসিস করে থমথমে গলায় বললেন জুলিয়া মুন। "কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের এই ১৩ বছরের পুঁচকে ছেলেটা শুক্রবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিলো। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের মোবাইলটা নিয়ে বের হওয়া অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ শনিবার কোটবাড়ীর লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করলো পুলিশ। আর আজ রবিবার সকালে কুবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্বরোডে নেমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে ফেললো। মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেলো পুরো মহাসড়ক, চারদিকে শুধুই বিচার চাওয়ার তীব্র স্লোগান!"
ড. নীলিমা তাপসী স্ক্রিনে ফুটে উঠা সোশ্যাল মিডিয়া আর ডিজিটালি ট্র্যাক করা তথ্য বিশ্লেষণ করে বললেন, "সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো এই চরম মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়। একটা ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুকে লোভ আর ক্ষোভের কারণে এভাবে লালমাইয়ের পাহাড়ি জঙ্গলে শেষ করে দেওয়া হলো! আজকের সমাজে প্রযুক্তি সহজলভ্য হলেও মানবিক বোধ আর নৈতিক মূল্যবোধ কতটা তলানিতে ঠেকেছে, এই ঘটনা তার এক জীবন্ত প্রমান।"
বিবি শাহীজান চোখে জল চেপে কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, "একজন মা—শিক্ষক ড. নাহিদা বেগম তার নাড়িছেঁড়া কোল খালি করলেন। আজ সকালে কুবি ক্যাম্পাসে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা আর কোটবাড়ীতে দাফন সম্পন্ন হলো। আমরা পাঠ্যবইয়ে কেবল জিপিএ-৫ আর ফলাফলের প্রতিযোগিতা শেখাচ্ছি, কিন্তু হৃদয়ের সহানুভূতির শিক্ষাটা আর দেওয়া হচ্ছে না। যার ফলে পরিচিত মুখগুলোই আজ এমন ঘাতক হতে দ্বিধা করছে না।"
তখনই ল্যাবের মূল কনসোলে এসে দাঁড়ালো ১০ বছরের প্রযুক্তি বিস্ময় মুজিযা। তার ডেনিম জ্যাকেটের পকেটে হাত, চোখে বুদ্ধিদীপ্ত চশমা। সচরাচর তার মুখে যে চপল হাসিটা থাকে, তা আজ একেবারে নিখোঁজ। সে স্ক্রিনের সংবাদ পোর্টালের পাতাগুলো এক সোয়াইপে সরিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের ব্যাকএন্ড অ্যানালিটিক্স খুললো।
"অপ্রতিম সরাসরি আমাদের সামনে নেই, কিন্তু নিউজ পোর্টালের এই ডাটা আর লালমাই পাহাড়ের ট্র্যাজেডি পুরো সমাজকে ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে," চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললো মুজিযা। "অপরাধের ব্যাকএন্ড বিশ্লেষণ করে আমি দেখছি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রলোভন, ভার্চয়াল গ্যাং কালচার আর পারিবারিক নজরদারির অভাব কিশোরদের অন্ধ গলিতে টেনে আনছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তিন ঘাতককে পুলিশ আটক করলেও আসল গলদটা সমাজ ও মনস্তাত্ত্বে। ডিজিটাল নিরাপত্তা কেবল কোডিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়, আসল নিরাপত্তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোয়।"
অভিলাষ মাহমুদ ভয়েস ডিকটেশন সাময়িক পজ করে শান্ত ও কবিসুলভ কণ্ঠে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, "ড. নাহিদা বেগমের চোখের জল আর মহাসড়কে থমকে যাওয়া যানবাহনের এই আর্তনাদ কেবল সংবাদপত্রের কোনো কালো হরফের খবর নয়, মা। এটা পুরো সমাজের এক গভীরে পৌঁছে যাওয়া ক্ষতের রূপক। প্রতিটা ঘরে এখন এমন এক একটা অপ্রতিম ঘুরে বেড়াচ্ছে—যাদের আমাদের বাঁচাতে হবে সঠিক মানবিক বিকাশ আর আধুনিক প্রযুক্তির ইতিবাচক শিক্ষার মাধ্যমে।"
মুজিযা তার আইপ্যাডের ডিজিটাল ইন্টারফেসে ব্যাকএন্ড সাইবার অ্যালার্ট অপশন চালু করলো। "আমরা অপরাধ ঘটার পর বিচার চাই, কিন্তু অপরাধ যেন শুরুতেই থমকে যায়—সেই ডিজিটাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ড. নাহিদা বেগমের অপ্রতিমের মতো আর কোনো কিশোরকে যেন কেবল যন্ত্রের লোভ বা সামাজিক পচনের কারণে অকালে হারিয়ে যেতে না হয়, সেই লক্ষ্যে 'টিম মুজিযা' এই নেটওয়ার্কের প্রতিটা সাইকো-ডিজিটাল থ্রেট মনিটর করবে।"
জুলিয়া মুন ড্রোন ক্যামেরার ফিড লাইভ করে বাকলিয়া, বলিরহাট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সচেতনতামূলক সিগন্যাল লগে তা সেন্ট্রালি সেন্ড করতে লাগলেন।
বাকলিয়ার সমতল ভূমির ওপর তখন সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়া যেন নিহত অপ্রতিমের জন্য এক নিঃশব্দ হাহাকার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
অভিলাষ মাহমুদ তাঁর ডিজিটাল নোটপ্যাডে শেষ লাইনটি মুখে বলে অটো-টাইপ করে নিলেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বললেন, "আমাদের কথা, লেখনী, আধুনিক প্রযুক্তি আর শিক্ষাকে একই কল্যাণের জায়গায় দাঁড় করাতে হবে, মা। অপ্রতিমদের মতো নিষ্পাপ প্রাণগুলোর আত্মত্যাগের পর আমাদের শেষ দায়বদ্ধতা এটাই—অন্যায় ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সময় থেকে এগিয়ে গিয়ে সত্য আর আলোর আওয়াজ তুলে যাওয়া।"
মুজিযা চশমাটা সোজা করে বাবার পাশে এসে দাঁড়ালো। অপ্রতিমের স্মৃতি, রাজপথের বিক্ষোভ আর সংবাদের বার্তাগুলো তাদের শান্ত চোখে এক নতুন, অপ্রতিরোধ্য সংকল্পের জন্ম দিল—প্রযুক্তি