সমস্ত হামদ ও সানা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাদেরকে ঈমানের অমূল্য নেয়ামতে ধন্য করেছেন। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক রহমাতুল্লিল আলামীন, তাজদারে মদীনা, হুযূর পুরনূর হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর দরবারে; যাঁর ইশকে অন্তর হয় প্রশান্তি, যাঁর আদর্শে নিহিত রয়েছে মুক্তি ও সফলতার পথ।
মানুষ ভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে পারে না। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো কিছুকে ভালোবাসে—কেউ পরিবারকে, কেউ সম্পদকে, কেউ খ্যাতিকে। কিন্তু একজন মু'মিনের জীবনে সবচেয়ে পবিত্র, মহিমান্বিত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা হলো আল্লাহ তাআলা ও তাঁর প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা।
এই ভালোবাসা কেবল মুখের দাবি হলে হয় না; বরং এই ভালোবাসাকে উপলব্ধি করতে হয় অন্তরের গভীর থেকে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা কোনো সাধারণ ভালোবাসা নয়, এটি হলো ঈমানের দাবি। এই ভালোবাসা এমন একটি অনুভূতি যা মানুষের চিন্তা, চরিত্র, আমল, আদব ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। যে হৃদয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর মহব্বত জেগে ওঠে, সে হৃদয় গুনাহ থেকে দূরে থাকে, ইবাদতে প্রশান্তি খুঁজে পায়, মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করে এবং জীবনের প্রতিটি সাধারণ থেকে মহৎ কাজে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করে।
ভালোবাসা বা মহব্বত হলো অন্তরের এমন এক আকর্ষণ, যা মানুষকে প্রিয়জনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত করে। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন'-এ বলেন—
“মহব্বত হলো হৃদয়ের এমন প্রবণতা, যা প্রিয় বস্তুর দিকে মানুষকে সম্পূর্ণভাবে আকৃষ্ট করে।”
অর্থাৎ, ভালোবাসা বা মহব্বত হলো অন্তরের এমন এক টান, যা মানুষকে প্রিয়জনের সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গীকৃত করে। সৃষ্টি জগতের অন্য কোনো কিছু বা মানুষের প্রতি ভালোবাসা জীবনকে সহজ করে তুলতে পারে, কিন্তু যখন এই ভালোবাসা হয় আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর জন্য, তখন তা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবন বদলে দেয়।
যখন এই ভালোবাসা হয় সমগ্র সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর জন্য, তখন মানুষ তাঁর আদেশ পালনে আনন্দ খুঁজে পায়। আর যখন রাসূল ﷺ-এর জন্য হয়, তখন তাঁর সুন্নাত অনুসরণে হৃদয় প্রশান্তি অনুভব করে। আল্লাহর ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়, বরং তা অর্জিত হয় আমলের মাধ্যমে। ফরয ইবাদতের প্রতি যত্ন, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, এবং বান্দার হক আদায় করা—এসবই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার পথে নিয়ে যায়।
হাদিসে কুদসিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবাসি”। (সহীহ বুখারী শরীফ, কিতাবুর রিক্বাক)
আল্লাহ আমাদের পরম সৃষ্টিকর্তা, সর্বশক্তিমান রিজিকদাতা ও অসীম দয়াময় রব্ব; তাই সৃষ্টির অন্য সবকিছুর চেয়ে তাঁকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসতে হবে। দুনিয়ার সব মায়া ও সম্পর্ক একসময় শেষ হয়ে গেলেও আল্লাহর প্রতি গভীর মহব্বত দিনদিন বাড়তে থাকে, যা মুমিন হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। এই পবিত্র ভালোবাসার টানেই বান্দা অন্যায় কাজ ছেড়ে দেয় এবং স্রষ্টার প্রতিটি নির্দেশ সানন্দে মেনে চলার শক্তি পায়। তাই আমাদের সকলের উচিত আল্লাহকে ভালোবাসা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্রত থাকা।
অনেকে এমন বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন তোলে যে, "আল্লাহ যখন সৃষ্টিকর্তা, তখন কেবল তাঁকেই ভালোবাসব—রাসূলকে ভালোবাসার কী প্রয়োজন?" এ ধরনের অমূলক উক্তি মূলত আল্লাহর প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সর্বোচ্চ শান ও মানের প্রতি চরম বেয়াদবি প্রকাশ পায়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “হে মাহবুব! আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাক তবে আমার অনুগত হয়ে যাও, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]
আর যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শান ও মানকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, তাদের শাস্তি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয় বা অবমাননা করে, আল্লাহ তাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে লানত (অভিশাপ) করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাকর শাস্তি।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৭]
উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে প্রতীয়মান যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি মহব্বত করা হল ঈমানের দাবি এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। এটি ব্যতীত প্রকৃত মু'মিন হওয়া সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা।
সুন্নাহ হলো এমন এক আলোকবর্তিকা, যা মানুষের চিন্তা, আচরণ ও জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার নিশ্চয়তা দেয়। পোশাক, আচার-আচরণ, কথা বলা, এমনকি ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজেও তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করা একজন মুমিনের পরিচয়।
সুতরাং বলা যায় রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণের গুরুত্ব শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশ নয়, বরং এটি একজন মুমিনের জীবনের পূর্ণতা অর্জনের পথ। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সুন্নাহ ছাড়া ভালোবাসা কেবল দাবি, কিন্তু সুন্নাহসহ ভালোবাসাই সত্যিকারের ইশক।
যে হৃদয়ে সত্যিকারের ইশকে রাসূল ﷺ জন্ম নেয়, সে হৃদয় কখনো তাঁর আদর্শ থেকে দূরে থাকতে পারে না; বরং প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে অনুসরণ করাকেই জীবনের সবচেয়ে পরম সৌভাগ্যের।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
“যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে, সে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে।” তিনি আরও ইরশাদ করেছেন—“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সব মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।” (সহীহ বুখারী শরীফ)
আ'লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান (রহ.) তাঁর 'ফাতোয়া-এ রেযভিয়ায় " উল্লেখ করেছেন—“ইশকে রাসূল ﷺ ছাড়া অন্তরের পরিশুদ্ধি পূর্ণতা লাভ করে না।”
ইশকে রাসূল ﷺ এমন এক পবিত্র নেয়ামত, যা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে এবং ঈমানকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।
যুগে যুগে লেখক, কবি ও সাহিত্যেকগণ তাঁদের কালাম ও লেখনীতে বারবার ইশকে রাসূল ﷺ-এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আ'লা হযরত ফাযেলে বেরেলভী ইমাম আহমদ রেজা খান (রহ.)-এর কালামেও এই মহব্বতের গভীরতা ফুটে ওঠে। তিলি লিখেছেন -
"কুরবানী দিল্লাল্লাহি, জান-এ-ইশকে রাসূল-এ-পাক, ইয়া রব হামেঁ ভী দে দে, ইশক-এ-খুদা ও রাসূল।"
"দিল হে ওহ দিল জো তেরি ইয়াদ সে মামূর রহে, সের হো ওহ সের জো তেরে কদমোঁ পে কুরবানী হো গয়া।"
বস্তুত, ইশক-এ-রাসূল ﷺ কেবল অনুভূতির নাম নয়; বরং এমন এক শক্তি, যা মানুষকে সুন্নাহর পথে অবিচল রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে রত রাখে। যে অন্তর ইশক-এ-রাসূল ﷺ-এর আলোয় আলোকিত হয়, তার কাছে দুনিয়ার সব ভালোবাসা ম্লান হয়ে যায়; কারণ সে জানে, এই মহব্বতের মাঝেই ঈমানের পূর্ণতা নিহিত।
পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি
ভালোবাসাই ঈমানের মূল ভিত্তি এবং একজন মুমিনের জীবনের প্রকৃত চালিকাশক্তি। এই পবিত্র ভালোবাসা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, তাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং সুন্নাহর পথে পরিচালিত করে। যে হৃদয়ে এই মহব্বত প্রতিষ্ঠিত হয়, সে হৃদয় দুনিয়ার মোহে হারিয়ে যায় না; বরং আখিরাতের সফলতার দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্যিকারের ইশক-এ-ইলাহী ও ইশক-এ-রাসূল ﷺ হিসেবে কবুল করুন। আমীন বেহুরমতে সায়িদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তথ্যসূত্রঃ-
•পবিত্র কুরআনুল কারীম,
সূরা আলে ইমরান: ৩১
সূরা আল-আহযাব: ৫৭
•সহীহ আল-বুখারী শরীফ
কিতাবুর রিক্বাক, হাদীস: 6502
•ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন — ইমাম গাযযালী (রহ.)
•হাদায়েকে বখশিশ — আ'লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান (রহ.)
লেখিকা-শিক্ষার্থীঃ
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম।