সুস্থ, সুন্দর, নির্মল ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সুস্থ জীবন ধারণের জন্য প্রতিটি প্রাণিকুলেরই প্রাকৃতিক পরিবেশ দরকার। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে যেমন গাছপালা, মাটি, পানি, বায়ু, জীবজন্তু, পশুপাখি, রাস্তাঘাট, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত, যানবাহন, বাড়িঘর ও কলকারখানা ইত্যাদি নিয়েই পরিবেশ। কোন পরিবেশে বাস করলে মানুষের সুবিধা হবে বা মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে, ইসলাম তা সুনিশ্চিত করেছে। তাই ইসলাম প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। আমাদের চারপাশে যা কিছু রয়েছে এবং যা প্রাকৃতিক পরিবেশ হিসেবে খ্যাত, এগুলো মহান স্রষ্টার অপার নেয়ামত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি এবং এতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং আমি পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু সুপরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছি। আমি তোমাদের জন্য তাতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছি এবং তোমরা যাদের রিজিকদাতা নও, তাদের জন্যও। প্রতিটি বস্তুর ভান্ডার আমার কাছে আছে এবং আমি তা প্রয়োজনীয় পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি। আমি বৃষ্টিগর্ভ বায়ু প্রেরণ করি, অতঃপর আকাশ থেকে বারিধারা বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করতে দিই, বস্তুত এর ভান্ডার তোমাদের কাছে নেই। (সুরা হিজর : ১৯-২২)
আল্লাহতায়ালা প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষের সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক বাসোপযোগী করে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ করে সৃষ্টি করেছেন। তাই তো আমরা দেখি প্রচণ্ড শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতে যেখানে বছরের প্রায় পুরোটাজুড়ে মাঠ, ঘাট, নদী-নালা সর্বত্রই বরফে ঢাকা থাকে, সেখানেও প্রাকৃতিক উদ্ভিদকুল সবুজের ডানা মেলে এবং বরফ আচ্ছাদিত মৎস্যকুল স্বাভাবিক জীবন পরিচালনের মাধ্যমে স্রষ্টার অপার মহিমার জানান দেয়। মূলত মহান আল্লাহ আমাদের অশেষ কল্যাণ ও উপকারের জন্য নানা প্রজাতির পশুপাখি ও জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন। মানুষ ও প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার জন্য উদ্ভিদ ও গাছপালা সৃষ্টি করেছেন। আবার পানি ও বায়ুর প্রয়োজন উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের। অন্যদিকে পাহাড়-পর্বত রক্ষা করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আর নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর পরিবেশের অন্তর্নিহিত প্রাণপ্রবাহ অব্যাহত রাখে। তাই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে পৃথিবীর মানুষকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দিকনির্দেশনা দিয়ে ঘোষণা করেছেন, তিনিই আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন। অতঃপর তা (বায়ু) মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে। অতঃপর তিনি (আল্লাহ) মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে (মেঘমালাকে) স্তরে স্তরে রাখেন। এরপর তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাদের ইচ্ছা তা (বৃষ্টি) পৌঁছান, তখন তারা আনন্দিত হয়। (সুরা রোম :৪৮)
মানবসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ আগুন। আগুনের অন্যতম উৎস বৃক্ষ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ থেকে অগ্নি উৎপাদন করে দিয়েছেন, সে মতে তোমরা তা থেকে আগুন জ্বালিয়ে নিতে পারো।’ (সুরা-৩৬ ইয়াসিন, আয়াত: ৮০)। ‘তোমরা যে অগ্নি প্রজ্বালিত করো, তা লক্ষ করে দেখছ কি? তোমরাই কি অগ্নি উৎপাদন বৃক্ষ সৃষ্টি করো, না আমি? আমি একে করেছি নিদর্শন এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্ত্র।’ (সুরা-৫৬ ওয়াকিয়া, আয়াত: ৭১-৭৩)।
পরিবেশকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সতেজ রাখতে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। ইসলাম বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় বিশেষভাবে উৎসাহ ও গুরুত্বারোপ করেছে। সবুজ বনায়ন ও বৃক্ষরাজি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীকে সুশোভিত ও অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। মহান আল্লাহর সৃষ্টি বৃক্ষরাজি যে কত বড় নিয়ামত পবিত্র কোরআনে একাধিক আয়াত থেকে তার প্রমাণ প্রতীয়মান। এ প্রসঙ্গে এরশাদ হচ্ছে, তারা কি লক্ষ্য করে না, আমি ঊষর ভূমির ওপর পানি প্রবাহিত করে তার সাহায্যে উদ্গত করি শস্য, যা থেকে তাদের গবাদিপশু এবং তারা নিজেরা আহার গ্রহণ করে।' (সুরা আস্ সিজদা : ২৭)।
বন ও বন্য পশুপাখি আল্লাহ পাকের অশেষ দান ও প্রাকৃতিক নিয়ামত। পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ প্রাকৃতিক উপায়ে খাদ্যশস্য ও মৌসুমি ফলমূল উৎপাদনের যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করে, বৃক্ষরোপণ তন্মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় কাজ। আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করে ভূপৃষ্ঠের প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ হিসেবে ফলবান বৃক্ষরাজি ও সবুজ-শ্যামল বনভূমির দ্বারা একে সুশোভিত ও অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। গাছপালা দ্বারা ভূমণ্ডল ও পরিবেশ-প্রাকৃতিক ভারসাম্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে তাই ঘোষণা এসেছে, আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি ও তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে নয়নাভিরাম সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উদ্গত করেছি। আর আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টিবর্ষণ করি এবং এর দ্বারা উদ্যান ও পরিপক্ব শস্যরাজি উদ্গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। (সুরা ক্বাফ : ৭-৯)
ইসলামে হালাল জীবিকা উপার্জন ও জনকল্যাণমূলক বিষয় হিসেবে কৃষিকাজ তথা ফলবান বৃক্ষরোপণ ও শস্যবীজ বপনের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহতায়ালা মানুষকে প্রকৃতির যতগুলো নেয়ামত দান করেছেন, তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হচ্ছে বৃক্ষরাজি। সৃষ্টিকুলের জীবন-জীবিকা ও বৃহৎ কল্যাণের জন্য গাছপালা, বৃক্ষলতা এবং মৌসুমি ফল-ফসলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মানুষের জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ, পুষ্টিকর ফলমূল, খাদ্যদ্রব্যের উপকারিতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে ইসলামে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। মানবদেহের জন্য খাদ্য হিসেবে বৃক্ষের ফলমূল বিশেষ উপকারী, তাই আল্লাহ এটিকে সৃষ্টির প্রতি বিশেষ নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে ঘোষণা এসেছে, তিনি তোমাদের জন্য বৃষ্টির দ্বারা উৎপাদন করেন ফসল, জয়তুন, খেজুর, আঙুর এবং সর্বপ্রকার ফলমূল। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। (সুরা নাহল : ১১)
বৃক্ষরোপণে যেভাবে উৎসাহ দিয়েছেন নবীজিঃ
গাছ মহান আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। গাছপালার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে জীবনধারণের অনেক উপাদান দিয়ে থাকেন। গাছ আমাদের চারপাশের সৌন্দর্য বাড়ায়, বায়ুদূষণ কমায়, অক্সিজেন সরবরাহ করে, ছায়া দেয়, মাটির ক্ষয় রোধ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাসুলে পাক (সা.) বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজ হাতে গাছ লাগিয়েছেন; সাহাবায়ে কেরামকে গাছ লাগাতে ও বাগান করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ব্যক্তিগত ও সামাজিক বনায়নও করেছেন। ইসলামে ফলদ বৃক্ষরোপণ ও ফসল ফলানোকে সবিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে সদকায়ে জারিয়া বা প্রবহমান দানরূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেননা, ব্যক্তি যদি একটি বৃক্ষরোপণ ও তাতে পরিচর্যা করেন, তাহলে ওই গাছটি যত দিন বেঁচে থাকবে এবং মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু যত দিন তার ফল বা উপকার ভোগ করতে থাকবে, তত দিন ওই ব্যক্তির আমলনামায় পুণ্যের সওয়াব লেখা হতে থাকবে। সদকায়ে জারিয়ার জন্য ছায়াদানকারী ফলবান বৃক্ষই তুলনামূলক বেশি উপকারী। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষরোপণ করে অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকাহ (দান) স্বরূপ গণ্য হবে। (বোখারি-২৩২০, মুসলিম-১৫৬৩/১২)
বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়; তবে সেই চারাটি রোপণ করবে।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১২৯০২)। তিনি গাছ লাগানোর বিষয়ে উৎসাহিত করে বলেন, ‘যে মুসলমান ফলদ গাছ লাগাবে, তা থেকে যা কিছু খাওয়া হয়, তা তার জন্য দানস্বরূপ; যা কিছু চুরি হয়, তাও দানস্বরূপ; বন্য জন্তু যা খেয়ে নেয়, তাও দানস্বরূপ; পাখি যা খেয়ে নেয়, তাও দানস্বরূপ; আর কেউ কিছু নিয়ে গেলে তাও তার জন্য দানস্বরূপ।’ (সহিহ্ মুসলিম)
বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করতে নির্দেশ দিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে, কেয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে। এমনিভাবে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বৃক্ষরোপণের প্রতি মানুষকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। একদা নবী করিম (সা.) হজরত সালমান ফারসি (রা.)-কে মুক্তির জন্য তার মালিকের কাছে গেলেন। মালিক মুক্তিপণ হিসেবে ১০০ খেজুর গাছ রোপণের শর্তারোপ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাতে রাজি হলেন এবং নিজ হাতে ১০০ খেজুর গাছের চারা রোপণ করে তাকে মুক্ত করলেন।
অনেককেই দেখা যায়, অযথা গাছের পাতা ছিঁড়ে ফেলে, এটি উচিত নয়। গাছেরও প্রাণ আছে। গাছ আল্লাহর জিকির করে। প্রয়োজন ছাড়া পাতা ছিঁড়ে তাকে কষ্ট দেওয়া মুমিনের পরিচয় নয়। এ ছাড়া অপ্রয়োজনে গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন মহানবী (সা.)। তিনি বলেন, ‘বিনা প্রয়োজনে যে ব্যক্তি বরইগাছ কাটবে, আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৪১)। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম আবু দাউদ (রহ.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অপ্রয়োজনে ও অন্যায়ভাবে খোলা ময়দানের বরইগাছ কেটে ফেলে, যার ছায়ায় পথচারী ও চতুষ্পদ প্রাণী আশ্রয় নিয়ে থাকে, আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, 'মক্কা ও মদিনার মাঝে অবস্থিত একটি বৃক্ষের কাছে যখন তিনি আসতেন, তখন তার নিচে শুয়ে বিশ্রাম করতেন। তিনি বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরূপ করতেন।' রাসুলে পাক (সা.)-সহ পরবর্তী ইসলামের সব খলিফা সৈন্যদের প্রতিপক্ষের কোনো গাছপালা বা শস্যক্ষেত্র ধ্বংস না করতে নির্দেশ দিতেন। রাসুলে পাক (সা.) বলতেন, 'তোমরা কোনো বৃক্ষ উৎপাটন করবে না(মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক)।' রাসুলে পাক (সা.) এগুলো সংরক্ষণের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারার বিশেষ এলাকাকে সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করেছেন। ওই এলাকায় গাছপালা কাটা এবং সেখানে পশুপাখি শিকার করা আজও নিষিদ্ধ।
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সৃষ্টি নিজ নিজ উপায়ে মহান আল্লাহর তাসবিহ করে। মানুষ যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে এবং সেই বৃক্ষের মাধ্যমে মানুষ, পাখি কিংবা অন্যান্য প্রাণী উপকৃত হতে থাকে, তবে সে উপকার যতদিন অব্যাহত থাকবে, ততদিন রোপণকারীর জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে সওয়াব বয়ে আনতে থাকবে। এভাবেই ইসলামে বৃক্ষরোপণ কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের একটি কর্মসূচি নয় বরং এটি ইবাদত, মানবকল্যাণ এবং আখিরাতের স্থায়ী কল্যাণ হিসেবে বিবেচিত।
লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চন্দনাইশ সিভিল সোসাইটি।