১৯৬১ সাল থেকে এপেক্স বাংলাদেশ মানবসেবা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভ্রাতৃত্বের চেতনা নিয়ে কাজ করে আসছে। "Service, Citizenship and Fellowship"—এই তিনটি মূল আদর্শকে ধারণ করে হাজার হাজার এপেক্সিয়ান সমাজের কম ভাগ্যবান মানুষের কল্যাণে নিজেদের সময়, শ্রম ও মেধা উৎসর্গ করেছেন। অনেক জাতীয় নেতা, সমাজসেবক এবং দক্ষ সংগঠকের জন্ম হয়েছে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এপেক্স বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভাজন, গ্রুপিং, অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ, আইনজীবীর নোটিশ এবং মামলা-মোকদ্দমার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যে সংগঠনের সভাকক্ষে সেবা প্রকল্প, নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
এপেক্সে একজন সদস্য যোগ দেন সমাজসেবা, ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে। তিনি কোনো আর্থিক লাভের জন্য আসেন না; বরং নিজের পরিবার, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার পাশাপাশি সমাজের জন্য কিছু করার প্রত্যয়ে যুক্ত হন। কিন্তু যদি সেই সদস্যকেই বারবার অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, উকিল নোটিশ কিংবা আদালতের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
মতপার্থক্য যে কোনো গণতান্ত্রিক সংগঠনে থাকতে পারে। ভিন্নমতও সংগঠনের শক্তি। কিন্তু ভিন্নমতের সমাধান যদি আলোচনার টেবিলের পরিবর্তে আদালতের বারান্দায় খোঁজা হয়, তাহলে সংগঠনের ভ্রাতৃত্ববোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংগঠনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সদস্যদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মান। সেটি দুর্বল হয়ে গেলে সংগঠনের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সেবার চেয়ে বিভাজনকে বড় করে দেখছি? আমরা কি নতুন নেতৃত্ব তৈরির চেয়ে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি? আমরা কি সংলাপের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছি?
এপেক্স বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক ব্যক্তি, পদ বা গ্রুপের ওপর নির্ভর করে না। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ক্লাব পর্যায়ের সাধারণ সদস্যদের ওপর, যারা নিঃস্বার্থভাবে সমাজসেবায় বিশ্বাস করেন। তাই সময়ের দাবি হলো—অহংকার নয়, সমন্বয়; বিভাজন নয়, ঐক্য; বিরোধ নয়, ভ্রাতৃত্ব।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই; অতএব তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় নয়, সাংগঠনিক জীবনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সংলাপের মাধ্যমে।
আজ যদি আমরা মামলা-মোকদ্দমা ও নোটিশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আলোচনার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে এপেক্স বাংলাদেশ আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। নতুন প্রজন্মের কাছে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং মর্যাদাপূর্ণ সংগঠন উপহার দিতে পারব।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি এপেক্স বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে উকিল নোটিশ নয়—ভ্রাতৃত্ব, সংলাপ এবং মানবসেবাই হবে আমাদের পরিচয়।
লেখকঃ
সদ্য অতীত জেলা গভর্নর–৩, এপেক্স বাংলাদেশ এন্ড ফাউন্ডার ও চার্টার প্রেসিডেন্ট, এপেক্স ক্লাব অব পটিয়া