ফেব্রুয়ারি এলেই বাঙালির চেতনায় এক নীরব আলো জ্বলে ওঠে- যেন স্মৃতি, শ্রদ্ধা আর শপথের মিলিত দীপশিখা। ভাষার মাস আমাদের শিকড়ের কাছে টেনে আনে, আর একুশে ফেব্রুয়ারি দাঁড় করিয়ে দেয় আত্মপরিচয়ের কঠিন আয়নার সামনে। তবু আজ প্রশ্ন জাগে- রক্তে লেখা সেই একুশের চেতনা কি আমরা বহন করছি, নাকি তা কেবল ফুল, গান আর আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তরুণরা! তাদের চোখে ছিল অদম্য চেতনা, বুকের মধ্যে নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছিল মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার অগ্নি। ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন ছিল সুসংগঠিত, লক্ষ্যনির্দিষ্ট এবং নৈতিকভাবে দৃঢ়; রাষ্ট্রের নির্মম দমন-পীড়নের মুখেও তারা পিছু হটেনি না। সেই আত্মত্যাগ বাঙালিকে শিখিয়ে গেছে- ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন হতে হয় শুধু সাহসী নয়, শৃঙ্খলাপূর্ণ, আদর্শনির্ভর ও জনসম্পৃক্ত। আজকের যুবসমাজও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে, এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের এবং আশা জাগানো দিক। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বৈষম্য, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণরা সোচ্চার হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনকে দিয়েছে দ্রুততা, বিস্তৃতি, আর অল্প সময়েই তাদের দাবি পৌঁছে যাচ্ছে জনমানসে। এটি আজকের প্রজন্মের শক্তি, কিন্তু এখানেই উদ্বেগের দিক। অনেক আন্দোলনে আবেগ আছে, কিন্তু দিকনির্দেশনার ঘাটতি চোখে পড়ে। দাবি কখনো অস্পষ্ট, কখনো পরস্পরবিরোধী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আন্দোলনকে যেমন জ্বালিয়ে তোলে, তেমনি দ্রুতই নিভিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন, ত্যাগ এবং আদর্শের জায়গা অনেক ক্ষেত্রে ফাঁকা থেকে যায়, এতে একুশের চেতনাকে পুরোপুরি বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একুশের আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল- ভাষা কেবল অনুভূতির বিষয় নয়; এটি চিন্তার শৃঙ্খলা। কিন্তু আজকের যুবসমাজ ভাষার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা নিয়ে গর্ব, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনে বাংলার অবহেলা, বিকৃতি ও বিদেশি শব্দের দাপট চোখে পড়ে। আন্দোলনের স্লোগান বাংলায়, কিন্তু চর্চায় বাংলা পিছিয়ে, এই দ্বৈততা একুশের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা আন্দোলন শুধুই অতীতের স্মৃতি নয়; এটি একটি চলমান দায়িত্ব। আজ যখন বিশ্বের বহু ভাষা বিলুপ্তির পথে, তখন প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রকৃত আন্দোলন। যদি যুবসমাজ এই দায়িত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে নেতৃত্ব দেয়, তবে একুশ নতুনভাবে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে এবং শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারে।
তবে বর্তমান আন্দোলনগুলোর আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো সহনশীলতার অভাব। মতভিন্নতা মানেই শত্রুতা, এ প্রবণতা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য বিপজ্জনক। একুশের চেতনা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক; সেখানে ভিন্নমত ছিল শক্তি, দুর্বলতা নয়। যুবসমাজকে সেই শিক্ষা নতুন করে আত্মস্থ করতে হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি আজ শুধু স্মৃতির দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন, প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি একুশের উত্তরাধিকার বহন করছি, নাকি কেবল তার নাম ব্যবহার করছি? আন্দোলন যদি আদর্শহীন হয়, তা ক্ষণস্থায়ী; আর আদর্শ যদি সংগঠিত শক্তিতে রূপ নেয়, তবে ইতিহাস বদলায়- একুশ তার প্রমাণ। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে যুবসমাজকে আবেগের পাশাপাশি দায়িত্বশীল হতে হবে। সচেতন, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মানবিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একুশের চেতনা আগামী প্রজন্মে পৌঁছাতে পারবে। ভাষা বাঁচুক কেবল স্মৃতিতে নয়- চর্চায়, চিন্তায় ও সংগ্রামে।
লেখক পরিচিতি: সেক্রেটারি, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট; লেখক ও কলামিস্ট।