বাংলাদেশের মানুষ বন্যার সঙ্গে পরিচিত। নদীমাতৃক এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবন-জীবিকার সঙ্গে বন্যার এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এক সময়ের মৌসুমি বন্যা ছিল কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু আজকের বন্যা আর সেই স্বাভাবিক বন্যা নয়। এটি ধ্বংসাত্মক, অপ্রত্যাশিত এবং ক্রমশ ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিচ্ছে, ফসল নষ্ট করছে, মানুষের স্বপ্ন ও জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। তাই আজ প্রশ্ন জাগে—এ কি শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি প্রকৃতির এক কঠিন অভিশাপ?
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখছি, বন্যার তীব্রতা ও বিস্তৃতি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতার কারণে লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক তার সারা বছরের ফসল হারাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের জন্য কি শুধুই প্রকৃতি দায়ী? উত্তর হলো—না। এর পেছনে আমাদের নিজেদেরও অনেক দায় রয়েছে।
গত কয়েক দশকে উন্নয়নের নামে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের যুদ্ধ শুরু করেছি। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী ও খাল দখল, জলাশয় ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে আমরা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছি। একসময় যেসব খাল ও জলাধার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত, সেগুলোর অনেকগুলো আজ দখল ও দূষণের শিকার। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশনের সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে।
চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যার চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, অপরিকল্পিত উন্নয়নের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেই রাস্তাঘাট নদীতে পরিণত হচ্ছে, ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে, কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ খরা, কখনো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতির আচরণ ক্রমেই অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, পরিবেশের ওপর অব্যাহত চাপ একসময় মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আজকের বন্যা সেই সতর্কবার্তারই বাস্তব প্রতিফলন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা এখনও শিক্ষা নিচ্ছি না। নদী দখল বন্ধ হয়নি, পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি, বনভূমি ধ্বংস বন্ধ হয়নি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। এই অতিরিক্ত বন্যা শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয়; বিশ্বের উন্নত দেশেও এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। চীনের মতো উন্নত রাষ্ট্রেও আজ বন্যার ফলে অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের জাতিগত অসচেতনতা এবং পরিবেশের বিরূপ প্রভাব। বিশ্বে আজ যেভাবে যুদ্ধ করে যাচ্ছে আর এই যুদ্ধে পরিবেশ ক্ষতিকারক অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে তাতে পুরো বিশ্বে জলবায়ুর উপর প্রভাব ফেলছে। অথচ প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার বাজেট বরাদ্দ রে জাতিসংঘে বিশ্বের মোড়লরা জলবায়ু সম্মেলন করে কিন্তু এই সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর সবাই ভুলে যায় । বাস্তবায়ন বিষয়ে কারো কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। দেখা যায় এই সম্মেলন শুধুমাত্র বিশ্ব নেতাদের একটা চায়ের আড্ডায় রূপান্তরিত হয়। আমাদের বাংলাদেশের মতো ছোট এবং বহুল জনসংখ্যার দেশেও হচ্ছে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়। অপরিকল্পিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যে অব্যাহত আগ্রাসন চলছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বন্যার ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর সামাজিক ও মানবিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন খাদ্য সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগে। শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার সংগ্রামে নেমে পড়ে।
তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার। আমাদের বুঝতে হবে, প্রকৃতির ওপর জয়লাভ করা সম্ভব নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই টিকে থাকতে হবে। নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার করতে হবে। বনায়ন বাড়াতে হবে, পাহাড় ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
আজকের বন্যা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। এটি কেবল কয়েক দিনের জলাবদ্ধতা বা মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি প্রকৃতির এক কঠিন সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনও সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
অতএব, এটি শুধু বন্যা নয়—এ যেন প্রকৃতির অভিশাপ, আমাদের অসচেতনতা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং পরিবেশ ধ্বংসের নির্মম পরিণতি। প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। তাই আসুন, প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হই, পরিবেশ সংরক্ষণে এগিয়ে আসি এবং একটি নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি।