দিনাজপুরের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন, সংগ্রাম, শোষণ ও প্রতিবাদের বাস্তবতাকে উপজীব্য করে রচিত কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর ছোটগল্প ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ এবার নাট্যরূপে চিত্রায়িত হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্য এই গল্প অবলম্বনে নির্মিত নাটকটির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন ড. মো. হারুনুর রশীদ।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থান ও গ্রামীণ লোকেশনে নাটকটির দৃশ্যধারণ সম্পন্ন হয়েছে। নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রবীণ সাঁওতাল কপিলদাস মুর্মু। শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত গ্রামকে ঘিরে তার জীবনের নানা ঘটনা বর্তমানের সঙ্গে অতীতের স্মৃতির সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
শওকত আলী দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন নদীর পাড়ের সাঁওতাল সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে লিখেছেন এই গল্প। লেখকের পৈতৃক নিবাসও দিনাজপুরে। এই গল্পে বেশ কিছু আঞ্চলিক সংলাপ রয়েছে বলে গল্পের নাট্যায়নে ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুরের অভিনেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সাঁওতালদের একসময়ের মোড়ল কপিলদাস মুর্মুর স্মৃতিতে একে একে ফিরে আসে তার কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলো। সেই স্মৃতির মধ্য দিয়ে উঠে আসে সাঁওতাল সমাজের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, শোষণ-বঞ্চনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার ইতিহাস।
নাটকটির কাহিনিতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামকে কেবল একজন ব্যক্তির গল্প হিসেবে নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কপিলদাস মুর্মুর ব্যক্তিগত স্মৃতি ও জীবনের বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে তাদের সামাজিক বাস্তবতা এবং অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা।
নাটকের শেষ দৃশ্যে প্রবীণ কপিলদাস মুর্মুর মধ্যে আবারও জেগে ওঠে তার যৌবনের প্রতিবাদী সত্তা। হাতে তীর-ধনুক নিয়ে তিনি অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে কপিলদাসের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সংগ্রাম একটি বৃহত্তর প্রতিবাদী চেতনার প্রতীকে পরিণত হয়।
ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও গ্রামীণ লোকেশনে নাটকটির দৃশ্যধারণ করা হয়েছে। শুটিংয়ে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে ঠাকুরগাঁওয়ের নীল পলাশ মাল্টিমিডিয়া। নাটকটির প্রযোজনা করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন উর্বশী ফোরাম।
নাটকটিতে অভিনয় করেছেন আরিফুল ইসলাম আরিফ, রূপ কুমার গুহ ঠাকুরতা কড়ি, মোহনা, পূজা রায়, ইউনুস আলী, ড. মো. হারুনুর রশীদ, আবদুল মালেক এবং শিশু শিল্পী বিশাল-সহ আরও অনেকে।
ইতোমধ্যে নাটকটির সম্পাদনা ও অন্যান্য কারিগরি কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হওয়ার পর শিগগিরই নাটকটি টেলিভিশনে সম্প্রচারের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবেও প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান উর্বশী ফোরাম।
সাহিত্য থেকে দৃশ্যশিল্পে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’-এর এই রূপান্তরের মাধ্যমে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, শোষণ-বঞ্চনা ও প্রতিবাদের ইতিহাস দর্শকদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই জনগোষ্ঠীর জীবন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।