চট্টগ্রাম—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর বাণিজ্যের হৃৎপিণ্ড। আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম, শিল্প-কারখানার বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু—সব মিলিয়ে এই নগরী দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার অন্যতম চালিকাশক্তি।
কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যে শহর দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরায়, সেই শহরই আজ নিজস্ব গতিতে থমকে আছে।
প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজট যেন চট্টগ্রামবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসগামী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স—কেউই এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।
সময়, শ্রম ও অর্থ—তিন দিক থেকেই নাগরিক জীবনে বাড়ছে চাপ।
নগরজীবন যেন ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে।
বাস্তব চিত্র: নগরজীবনের গতি থমকে
চট্টগ্রাম মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো—জি.ই.সি মোড়, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, চকবাজার, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন, নিউমার্কেট—প্রায় সারাদিনই যানজটে অচল থাকে।
কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো লেগে যাচ্ছে এক থেকে দুই ঘণ্টা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন বিপুল কর্মঘণ্টা শুধুমাত্র যানজটে নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি অপচয়, যানবাহনের অপারেটিং খরচ এবং পরিবেশ দূষণ।
ধোঁয়া ও শব্দ দূষণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমশ বাড়ছে।
শুধু তাই নয়, জরুরি সেবাও এই যানজটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অবস্থার অবনতি ঘটছে—যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
উড়াল সেতু: আশার আলো নাকি আংশিক সমাধান
গত এক দশকে চট্টগ্রামে একাধিক উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে—যার মধ্যে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার অন্যতম।
এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল যানজট নিরসন, দ্রুত যান চলাচল নিশ্চিত করা এবং নগরের ট্রাফিক চাপ কমানো।
সফলতার দিক:
কিছু নির্দিষ্ট রুটে যান চলাচল আগের তুলনায় দ্রুত হয়েছে
ভারী যানবাহনের জন্য বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে
নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে
শহরের কিছু অংশে ভ্রমণ সময় কিছুটা কমেছে
ব্যর্থতার দিক:
পরিকল্পনার ঘাটতি: ফ্লাইওভারের সাথে সংযুক্ত সড়কগুলো প্রশস্ত না হওয়ায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পয়েন্টে তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে
যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি: নতুন অবকাঠামো তৈরি হলেও যানবাহনের সংখ্যা আরও দ্রুত বেড়েছে
গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে
ফলাফল হলো—উড়াল সেতু আংশিক স্বস্তি দিলেও সামগ্রিকভাবে যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
বরং কিছু ক্ষেত্রে নতুন ধরনের জটের সৃষ্টি হয়েছে।
যানজটের মূল কারণ: বহুমাত্রিক সংকট
চট্টগ্রামের যানজট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির সম্মিলিত ফল।
১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ
শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
২. সংকীর্ণ ও দখলকৃত সড়ক
ফুটপাত দখল, অবৈধ স্থাপনা, রাস্তার পাশে পার্কিং—এসব কারণে কার্যত সড়কের প্রস্থ কমে গেছে। ফলে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
৩. দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা
মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন না থাকায় মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও সিএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
৪. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা
ডিজিটাল সিগন্যালিং ব্যবস্থা কার্যকর নয়, অনেক জায়গায় এখনো ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ চলছে।
আইন প্রয়োগেও দুর্বলতা রয়েছে।
৫. সমন্বয়ের অভাব
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
৬. সচেতনতার অভাব
নিয়ম ভঙ্গ, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো, উল্টো পথে চলাচল—এসব আচরণও যানজট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
করণীয়: টেকসই সমাধানের বাস্তব পথ
যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
১. সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন
একটি আধুনিক, তথ্যভিত্তিক ট্রাফিক ও নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু
বাস র্যাপিড ট্রানজিট (BRT) চালু করা
শহরের ভেতরে রেল ও নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো
বাস সার্ভিসকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা
৩. সড়ক দখলমুক্ত করা
ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করতে কঠোর অভিযান চালাতে হবে এবং তা নিয়মিত বজায় রাখতে হবে।
৪. স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম চালু
ডিজিটাল সিগন্যাল, সিসিটিভি নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৫. বাইপাস ও বিকল্প সড়ক নির্মাণ
ভারী যানবাহনের জন্য শহরের বাইরে বিকল্প রুট তৈরি করলে নগরের ভেতরের চাপ কমবে।
৬. কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা
আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—দুইটিই একসাথে এগিয়ে নিতে হবে।
উপসংহার: এখনই সময় কার্যকর উদ্যোগের
চট্টগ্রামের যানজট কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। উড়াল সেতু বা সড়ক সম্প্রসারণ এককভাবে সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক তদারকি।
নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় “অর্থনৈতিক রাজধানী” হিসেবে পরিচিত এই শহর ধীরে ধীরে তার গতি ও সক্ষমতা হারাবে।
প্রশ্ন রয়ে যায়—কবে মিলবে যানজটের মুক্তি? উত্তরটি নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্ত ও আগামী দিনের বাস্তবায়নের ওপর।
লেখক
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এপেক্স বাংলাদেশ।