চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে নাগরিক ফোরামের ২৫ দফা স্মারকলিপি নাগরিক উদ্যোগকে স্বাগত কবীর ভূঁইয়ার, যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান।
চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহনীয় যানজট নিরসন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২৫ দফা দাবি নিয়ে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক)-এর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়ার কাছে এ স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হয়।
নাগরিক ফোরামের এই গঠনমূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, নগরীর যানজট নিরসনে নাগরিক সমাজের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্থাপিত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মূল সংকট ও নাগরিক ফোরামের অবস্থান
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগের মূল কেন্দ্র। তবে ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, কালো ধোঁয়া এবং হাইড্রোলিক হর্নের কারণে নগর জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
নাগরিক ফোরামের নেতারা স্পষ্ট করেন যে, তারা কেবল সমালোচনা নয়, সমাধানের অংশীদার হতে চান।
মো. কামাল উদ্দিন কেন্দ্রীয় মহাসচিব বলেন আমরা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে আসিনি। চট্টগ্রামবাসী দীর্ঘদিন ধরে যানজটের দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। শুধু সাময়িক অভিযান নয়, ফুটপাত দখল বা অবৈধ পার্কিংয়ের মতো মূল কারণ চিহ্নিত করে এলাকাভিত্তিক স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
মাহফুজুর রহমান কার্যকারী সভাপতি ও সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সব এলাকার সমস্যা এক নয়। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা করে কোন সময়ে কেন যানজট হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন ইতিহাস গবেষক বলেন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে নগর পরিকল্পনা করতে হবে। ফুটপাত মুক্ত করে পথচারীবান্ধব ও ঐতিহ্যসম্মত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।
সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম নাগরিক ফোরাম নেতা বলেন "ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা মূল সড়কে নামতে বাধ্য হন, যা যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ায়। ফুটপাত মুক্ত রাখতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।"
হামিদ হোসাইন (মহানগর সভাপতি): "যানজট মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করছে। প্রশাসন এগিয়ে এলে নাগরিক ফোরাম সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
দুলাল কান্তি বড়ুয়া মহানগর সাধারণ সম্পাদক বলেন অভিযানের ধারাবাহিকতা ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রিয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাটসহ ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল বলেন সিসিটিভি ক্যামেরা ও প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার জন্য 'গ্রিন করিডর' চালু করা আবশ্যক।"
২৫ দফা দাবির উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ
১. যানজটপ্রবণ এলাকাকে বিশেষ ট্রাফিক জোন ঘোষণা ও পিক আওয়ারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন।
২. ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা ও অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা।
৩. অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক নিয়ন্ত্রণ।
৪. ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন অপসারণ এবং হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ করা।
৫. রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, চকবাজার, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও অক্সিজেনে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা।
৬. চাকতাই-খাতুনগঞ্জে ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং সিএনজি ও বাসের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
৭. প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন এবং জরুরি যানবাহনের জন্য দ্রুত চলাচলের ব্যবস্থা।
৮. সিএমপি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সিডিএ ও বিআরটিএ-এর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা।
উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন। চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি হামিদ হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া।
এছাড়া ফোরামের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন:
এস. এ. মান্নান, বিপ্লব বড়ুয়া, ড. হামিদ হোসাইন, লায়ন মোহাম্মদ মজিবুর রহমান শাহিন, ডা. মো. আনোয়ার হোছাইন (সাদ্দাম), সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম, নাহিদা নাজু, এস. বি. সুমী, লায়ন মো. মীর হোসেন মাসুম, মো. হোসেন, সোহেল, মহিউদ্দীন, লায়ন মিনহাজুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ মনজুর আলম, মো. বেলাল উদ্দীন, লায়ন ফরহাদুল হাসান মোস্তফা, লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, শাহ আলম সাজু তালুকদার, মোহাম্মদ মনজুর, মোহাম্মদ বাপ্পি, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ওসমান এবং ওয়াহিদ আলম মাস্টার।
পরবর্তী সিদ্ধান্ত: জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি
স্মারকলিপি প্রদান শেষে পুলিশ লাইন ক্যান্টিনে কার্যকরী সভাপতি মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে একটি টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নগরবাসীর মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা বাড়াতে নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।