আলমগীর আলম।
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের কোটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন চলাচলের প্রধান প্রাণরেখা। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চট্টগ্রাম বন্দর, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির সঙ্গে এই মহাসড়কের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল এবং জরুরি সেবা প্রদানকারী যানবাহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে চলাচল করছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, পর্যটক, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবার জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই সড়ক।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক এখন ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী সড়কে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা। কোনো দুর্ঘটনায় নিভে যাচ্ছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জীবন, কোথাও মা হারাচ্ছেন সন্তান, কোথাও শিশু হারাচ্ছে তার বাবাকে। অসংখ্য পরিবার মুহূর্তেই নেমে যাচ্ছে অন্ধকার অনিশ্চয়তায়।
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী এলাকা থেকে শুরু করে পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে অসংখ্য বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকের অনেকগুলো এমনভাবে নির্মিত হয়েছে, যেখানে সামান্য অসতর্কতা কিংবা অতিরিক্ত গতি মুহূর্তেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভারী যানবাহন, দূরপাল্লার বাস কিংবা দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের জন্য এসব বাঁক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্ষাকালে বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভেজা সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যানবাহন খাদে পড়ে যাওয়া, বিপরীতমুখী গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ কিংবা উল্টে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড না থাকায় দূরপাল্লার চালকরা বিপদের মুখে পড়েন আরও বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক, পরিবহন শ্রমিক ও নিয়মিত যাত্রীদের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এখনো আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কোথাও নেই গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কোথাও নেই পর্যাপ্ত রোড মার্কিং, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে সড়কের অংশবিশেষ। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
চলতি বছরের শুরু থেকেই পটিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া ও কক্সবাজার অংশে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। কোথাও বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, কোথাও যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, আবার কোথাও দ্রুতগতির মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তরুণ শিক্ষার্থী ও যুবকরা।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ হয়, সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে। কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার নীরব হয়ে যায়। বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ বহু বছর ধরে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষ তাদের দাবি তুলে ধরেছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সচেতন নাগরিক সমাজও একাধিকবার এই সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করার দাবি জানিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পুনঃনকশা করা, সড়ক প্রশস্ত করা কিংবা আন্তর্জাতিক মানের ট্রাফিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি সাধারণ মানুষের চোখে পড়ছে না।
এটি অত্যন্ত হতাশাজনক যে, দেশের অন্যতম পর্যটন মহাসড়ক হয়েও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার সড়ক এখনো পূর্ণাঙ্গ নিরাপদ অবকাঠামোতে রূপ নিতে পারেনি। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এই সড়ক ব্যবহার করে কক্সবাজারে যাতায়াত করছেন। অথচ পর্যটকদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আধুনিক সড়কব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আধুনিক মহাসড়কে বাঁকগুলো বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ নকশায় নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি থাকতে হবে উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল গতিনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, মিডিয়ান ব্যারিয়ার, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, সিসিটিভি নজরদারি এবং জরুরি উদ্ধার সুবিধা। কিন্তু চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের বহু অংশ এখনো সেই মানদণ্ড থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
এদিকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কক্সবাজার রেল সংযোগ, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নের কারণে ভবিষ্যতে এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়বে। তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো, মহাসড়কের সব ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক দ্রুত চিহ্নিত করে সেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে সোজা করা। যেসব স্থানে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ট্রাফিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনীয় জায়গা অধিগ্রহণ করে সড়ক প্রশস্তকরণ কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ছয় লেনে উন্নীত করতে হবে। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যমান সড়ক আর পর্যাপ্ত নয়। যানবাহনের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে চার লেন কিংবা সংকীর্ণ সড়ক দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
এছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা স্থাপন, উন্নতমানের রোড মার্কিং, ক্যাটস