আলমগীর আলম,পটিয়া।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন এবং জনজীবনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছিল চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেলপথ।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চালু হওয়া এই রেললাইন দ্রুতই সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা দখল করে নেয়—স্বল্প খরচে আরামদায়ক ও তুলনামূলক নিরাপদ ভ্রমণের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে।
কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
সম্ভাবনার এই রেলপথ ক্রমেই উদ্বেগ, অনিরাপত্তা এবং আস্থাহীনতার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে।
বাড়ছে অপরাধ, কমছে আস্থা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্টেশন এলাকায় ছিনতাই, হামলা, এমনকি যাত্রীদের ওপর পাথর নিক্ষেপ, সংঘবদ্ধ আক্রমণের অভিযোগ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভোর কিংবা সন্ধ্যার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে পড়ছেন।
টিকিট কাউন্টার খোলার আগেই লাইনে দাঁড়ানো যাত্রীদের লক্ষ্য করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে—মোবাইল ফোন, নগদ অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে শারীরিক হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়।
পটিয়া, ষোলশহর, সাতকানিয়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা ও দোহাজারী—এসব গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ঘিরে সাম্প্রতিক সহিংসতার খবর স্থানীয়ভাবে বেশ আলোচিত।
আহত যাত্রীদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান নয়।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—স্টেশনই যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা কোথায়?
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ: ভয়াবহ বাস্তবতা
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নতুন নয়, তবে বর্তমানে এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ট্রেনের জানালার কাঁচ ভেঙে যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।
এতে নারী ও শিশু যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।
সম্প্রতি এক যাত্রীর চারটি দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঘটনা এই ঝুঁকির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
এছাড়া একাধিক যাত্রীর মাথা ফেটে গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এই ধরনের হামলা কেবল শারীরিক ক্ষতি করে না, বরং মানুষের মানসিক নিরাপত্তাবোধকেও ধ্বংস করে দেয়।
রেলপথের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় এবং অর্থনীতিতেও।
সচেতনতার লড়াই:
একক প্রচেষ্টা থেকে সামাজিক আন্দোলন এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক রশীদ এনাম দীর্ঘদিন ধরে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ প্রতিরোধে দেশব্যাপী লিফলেট, ফেস্টুন ও সরাসরি জনসংযোগের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করে আসছেন।
তাঁর মতে, “আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।” তিনি সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এই বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও করণীয় রেলওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। নিয়মিত টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
স্টেশন এলাকা, প্ল্যাটফর্ম, আন্ডারপাস এবং প্রবেশ ও প্রস্থান পথগুলোতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে অন্ধকার ও নির্জন স্থানগুলোতে দ্রুত আলোকায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ
সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ।
যেমন: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি ট্রেন ছাড়ার আগে নিয়মিত নিরাপত্তা বার্তা প্রচার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়ন ও নজরদারি রাতের বেলায় বিশেষ অভিযান জোরদার
স্টেশনভিত্তিক মনিটরিং কমিটি গঠন
জনসম্পৃক্ততা: নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি
নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও।
স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং যাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা সম্পর্কে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
এখনই পদক্ষেপ না নিলে মূল্য দিতে হবে বড়
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়;
এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
এই রেললাইন পর্যটন শিল্পকে নতুন গতি দিয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সারাদেশের সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে যাত্রীরা বিকল্প পরিবহনের দিকে ঝুঁকবেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই বৃহৎ বিনিয়োগের সুফল, কমে যাবে মানুষের আস্থা।
উপসংহার:
নিরাপদ রেল ভ্রমণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
আজই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না, বরং দেশের উন্নয়নযাত্রাও পাবে আরও শক্ত ভিত। অন্যথায়, অবহেলার এই মূল্য দিতে হতে পারে আরও বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির মাধ্যমে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।