চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রই নয়; এটি চট্টগ্রামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও নাগরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল। বছরের প্রায় প্রতিদিনই এখানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে সেমিনার, আলোচনা সভা, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, সংবাদ সম্মেলন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনের অন্যতম প্রধান ভেন্যু হলো ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল’।
একটি ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তন হিসেবে এই হলের প্রতি ব্যবহারকারীদের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে হলটির ব্যবহার ও চাহিদা বাড়লেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সেবার মান সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সময়ের সঙ্গে ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল’-এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও, পরিতাপের বিষয়—সেবার মান সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। বরং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের আয়োজকদের পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীদের অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তন হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো সমস্যা হলো আসন ব্যবস্থা। হলের বেশকিছু চেয়ার দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা কিংবা ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ফলে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অতিথিদের অনেকেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও অস্বস্তিকর পরিবেশে বসতে বাধ্য হন। একটি মর্যাদাপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত মিলনায়তনে এমন অবস্থা শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, বরং সেবার মান সম্পর্কেও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
হলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো লিফটব্যবস্থা। একদিকে লিফটের বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি প্রায়ই বিকল থাকে, অন্যদিকে বিদ্যমান লিফটটির ধারণক্ষমতাও হলের ব্যবহারকারীদের তুলনায় অপ্রতুল। ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল’-এ প্রায়ই ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটে। অথচ এত বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী ও অতিথির জন্য একটি ছোট ধারণক্ষমতার লিফটের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে অনুষ্ঠান শুরুর আগে ও শেষে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং ভিড়ের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, নারী, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই ভোগান্তি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একটি বহুল ব্যবহৃত ও মর্যাদাপূর্ণ মিলনায়তনে নিরাপদ, সচল ও পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার লিফটব্যবস্থা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন। তাই বিদ্যমান লিফটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি অধিক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন লিফট স্থাপন অথবা লিফটসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা সময়ের দাবি।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা অনুষ্ঠানগুলোকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ সময় ধরে অনুষ্ঠান পরিচালনা ও অংশগ্রহণ করা অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। একটি আন্তর্জাতিক মানের নগরীতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনায়তনে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো হলের সাউন্ড সিস্টেম। আধুনিক একটি মিলনায়তনের প্রাণই হলো নির্ভরযোগ্য শব্দব্যবস্থা। অথচ প্রায়ই মাইক্রোফোনে শব্দ বিচ্ছিন্ন হওয়া, প্রতিধ্বনি, ফিডব্যাক কিংবা শব্দের ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যার কারণে অনুষ্ঠান পরিচালনা ব্যাহত হয়। বক্তা, অতিথি ও শ্রোতাদের জন্য এটি যেমন বিব্রতকর, তেমনি একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে হল ভাড়ার হার সময়ের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও সেবার মানে তার সমানুপাতিক উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয় না। ভাড়া বৃদ্ধি যদি অনিবার্যও হয়, তবে তার যৌক্তিক প্রতিফলন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং মানসম্মত গ্রাহকসেবায় দৃশ্যমান হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহারকারীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা বাড়ছে। সেবার মান উন্নয়ন ছাড়া শুধু ভাড়া বৃদ্ধি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের মর্যাদা ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখতে হলে ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল’-এর সার্বিক সংস্কার ও আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ভাঙা চেয়ার প্রতিস্থাপন, লিফট মেরামত, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন এবং ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেবার মান নিশ্চিত করা—এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আমরা বিশ্বাস করি, সমালোচনা নয়, গঠনমূলক পরামর্শই একটি প্রতিষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সম্মানিত পরিচালনা পর্ষদ ব্যবহারকারীদের এই যৌক্তিক প্রত্যাশাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। একটি আধুনিক, আরামদায়ক ও আন্তর্জাতিক মানের ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল’ গড়ে উঠুক—এটাই চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও সংগঠক; ভাইস প্রেসিডেন্ট, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফূলী এলিট।