দেশের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর আজ গভীর সংকটে।
আমদানি–রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার এই বন্দরকে ঘিরে চলমান আন্দোলনের কারণে কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
দিনের পর দিন পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক চাপ তৈরি হচ্ছে। উদ্বেগ বাড়ছে জাতীয় অর্থনীতিকে ঘিরে।
চট্টগ্রাম বন্দর শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি ও রপ্তানি এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
শিল্পকারখানার কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় অংশ এই বন্দরনির্ভর।
অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পক্ষের আন্দোলন, অসন্তোষ ও দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে বন্দরে জাহাজ জট বাড়ছে, কনটেইনার খালাস হচ্ছে না বা ধীরগতিতে হচ্ছে।
অনেক জাহাজ দিন দিন অপেক্ষমাণ থাকায় শিপিং খরচ বাড়ছে, ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের ওপর।
ফলে আসন্ন রমজানে সাধারণ ভোক্তার কাঁধেও বাড়তি চাপ এসে পড়বে বলে বিজ্ঞ মহলের ধারনা।
এই সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাননীয় নৌ উপদেষ্টার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেখানে সমস্যা চিহ্নিত করা, দাবি-দাওয়ার যৌক্তিকতা যাচাই এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি আদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান হ্রাস এবং বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সংকটের মূল কারণ কী?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ। সময়মতো আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তা আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থার অভাবও সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের দিক তুলে ধরছেন—
প্রথমত, সব পক্ষকে নিয়ে গঠনমূলক ও ধারাবাহিক সংলাপ জরুরি। এককালীন বৈঠক নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যৌক্তিক ও অযৌক্তিক দাবির স্পষ্ট বিভাজন করতে হবে। যৌক্তিক দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে এবং অযৌক্তিক দাবির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আইনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
তৃতীয়ত, বন্দরের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিক ও দক্ষ করতে হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়ালে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।
চতুর্থত, জরুরি ভিত্তিতে পণ্য খালাস সচল রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে দেশের শিল্প ও বাজার সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে না পড়ে।
পঞ্চমত, চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এখানে যে কোনো অচলাবস্থার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত পুরো দেশকেই বহন করতে হয়।
উপসংহার
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে চলমান আন্দোলন এখন আর কোনো একক গোষ্ঠীর বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সংকট।
সময়মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত ও সমঝোতায় না পৌঁছালে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
তাই রাষ্ট্র, প্রশাসন, আন্দোলনকারী পক্ষ এবং ব্যবসায়ী সমাজ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচল রাখা মানে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা।
এখনই প্রয়োজন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, বাস্তবভিত্তিক সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সংকট উত্তরণ।
লেখক:
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
যুগ্ন সদস্য সচিব:পটিয়া সচেতন নাগরিক ফোরাম।