পরিচালককে নাগরিক ফোরামের ৭ দফা প্রস্তাব—দালালমুক্ত হাসপাতাল, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়ানোর তাগিদ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইউনিট-২ দ্রুত চালু, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও শয্যা নিশ্চিত করা, পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ব্যবস্থা, রোগী ও স্বজনদের হয়রানি বন্ধ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখার দাবি জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ। মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ফোরামের একটি প্রতিনিধি দল এ মতবিনিময়ে অংশ নেয়।
মতবিনিময়কালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান চিকিৎসাসেবা, রোগীর চাপ, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকারিতা এবং রোগী-স্বজনদের বিভিন্ন ভোগান্তির বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ইউনিট-২ ও ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন
সভায় নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন হাসপাতালের ইউনিট-২ চালুর অগ্রগতি, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আগেভাগেই পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি।
এ সময় ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়, যাতে রোগীরা দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা পান।
রোগী হয়রানি ও দালালচক্র বন্ধের দাবি
মতবিনিময়ে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও রোগী হয়রানির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অনেক সময় হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানির শিকার হতে হয়। এতে রোগী ও স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা গ্রহণেও নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
হাসপাতালকে দালাল ও হয়রানিমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখার তাগিদ
হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়মিত সচল রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো রোগীকে বাইরে যেতে হলে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হয়। তাই হাসপাতালের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা প্রয়োজন।
জনবল বৃদ্ধির দাবি
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সহায়ক জনবল পর্যাপ্ত কি না—এ বিষয়েও আলোচনা করেন ফোরামের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, আধুনিক অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল বৃদ্ধি এবং কর্মরতদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নাগরিক ফোরামের দাবির জবাব দেন পরিচালক
নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও প্রস্তাব মনোযোগ দিয়ে শোনেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন। তিনি হাসপাতালের চলমান কার্যক্রম, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসাসেবা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে প্রতিনিধি দলকে অবহিত করেন।
হাসপাতালের সেবার মান আরও উন্নত করতে নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, রোগী হয়রানি কমানো এবং দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান পরিচালক।
তিনি বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতি তাঁর আলাদা দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘অভিযোগ নয়, সমাধানের পথ খুঁজতেই মতবিনিময়’
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। ফলে এ হাসপাতালকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। হাসপাতালের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই এই মতবিনিময়ের মূল উদ্দেশ্য।”
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে ভোগান্তিতে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি হাসপাতালের সেবাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
উপস্থিত ছিলেন যারা
মতবিনিময় সভায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহানগর সভাপতি হামিদ হোসাইন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ সলিম, মহানগর সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, ওয়াহিদুল আলম মাস্টার, মহসিন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক দুলাল বড়ুয়া, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ শাসুল আলম রানা, লায়ন মিনহাজুর রহমান, লায়ন ফরহাদুল হাসান মোস্তফা, সাজু তালুকদার, মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ওসমান ও আব্দুল মান্নানসহ ফোরামের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও নাগরিক প্রত্যাশার কথা তুলে