পটিয়া প্রতিনিধি।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় পাঁচ বছর বয়সী শিশু মো. জায়ানকে অপহরণের পর হত্যা করে মুক্তিপণের নাটক সাজানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে হত্যার পর পরিবারের সদস্যদের বিভ্রান্ত করতে মুক্তিপণের চিরকুট লেখা ও পাঠানো হয়েছিল। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গোবিন্দারখীল এলাকায় হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পটিয়া থানার সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা শিশু হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। পরে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত সাদিয়া সুলতানা নিহার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
স্থানীয়রা জানান, নিহত জায়ানের পরিবারের বাড়ি এবং অভিযুক্তদের বাড়ি পাশাপাশি অবস্থিত। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে শিশুটিকে কৌশলে ডেকে নেওয়া হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জায়ানের স্বজনরা জানান, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি চালাতে থাকেন। এরই মধ্যে বাড়িতে একটি রহস্যজনক চিরকুট এসে পৌঁছায়। চিরকুটে তিন লাখ টাকা ও একটি আনলক মোবাইল ফোন দাবি করা হয়। সেখানে লেখা ছিল, টাকা ও মোবাইল নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিলে শিশুটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং পুলিশকে জানালে তার লাশ ফেরত পাওয়া যাবে।
তবে তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, চিরকুট লেখার আগেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছিল। পুলিশ সূত্র জানায়, অপহরণের পর হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে জায়ানকে হত্যা করা হয়। এরপর ঘটনাকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা হিসেবে দেখাতে হাতে লেখা চিরকুটটি পরিবারের বাড়িতে পাঠানো হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, শিশুটির মরদেহ বস্তাবন্দি করে বাড়ির পেছনের একটি ডোবায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুক্তিপণের টাকা ও মোবাইল রাখার জন্য বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে একটি পরিত্যক্ত দোকানঘর নির্ধারণ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, স্থানটি এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল যাতে দূর থেকে নজরদারি করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
পুলিশের তদন্তে চিরকুটের হাতের লেখা, সন্দেহভাজনদের চলাফেরা, প্রযুক্তিগত তথ্য ও স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।
শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারি ও এলাকাবাসীর ক্ষোভে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
নিহতের এক স্বজন বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম আমাদের সন্তান বেঁচে আছে। মুক্তিপণের টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেছি। কিন্তু যারা চিঠি লিখেছে, তারা তো এর আগেই তাকে হত্যা করেছে। এর চেয়ে নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে?”
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে আবার মুক্তিপণের নাটক সাজানো হয়েছে। এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে সমাজে ভয়াবহ বার্তা যাবে।”
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, “এটি একটি পরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। অপহরণের পর শিশুটিকে হত্যা করে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য মুক্তিপণের চিরকুট ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার দুপুরে পটিয়া পৌরসভার গোবিন্দারখীল এলাকা থেকে পাঁচ বছর বয়সী মো. জায়ান নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।