মোঃ কায়সার , চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য সিঙ্গাপুর, দুবাই ও হংকংয়ের মতো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করতে হবে। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র।
২০ ডিসেম্বর শনিবার নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, চট্টগ্রাম সমুদ্র, পাহাড় ও সমতলের এক অনন্য অঞ্চল। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), ভারী শিল্প, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই সম্ভাবনাকে পূর্ণরূপ দিতে আর্থিক খাতের সুদৃঢ় ভূমিকা অপরিহার্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে উৎপাদনমুখী খাতে পর্যাপ্ত ও স্বল্পমূল্যের ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।
তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে এসএমই এবং কৃষিঋণের প্রবাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধানদের আরও আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের অব্যবহৃত তহবিল উপযুক্ত গ্রাহকের মাঝে বিতরণের নির্দেশনা দেন।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে প্রতিটি ব্যাংককে অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক সাক্ষরতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন গভর্নর। তিনি বলেন, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সহজ করতে দেশের সব বন্দর ও বিমানবন্দরে সার্বক্ষণিক লেনদেনের জন্য দ্রুত আরটিজিএস চালু করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম ক্যাশলেস জেলা হিসেবে কক্সবাজারকে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
গভর্নর বলেন, ক্যাশলেস বাংলাদেশ বাস্তবায়নে প্রত্যেক নাগরিকের হাতে ছয় থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন পৌঁছানো প্রয়োজন। প্রান্তিক এলাকায় নারী এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. মকবুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. খসরু পারভেজ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আশিকুর রহমান।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল আমিন। প্রবন্ধে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক রূপান্তর, ব্লু-ইকোনমি, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, মীরসরাই শিল্পনগর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এছাড়া ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে কৃষি, সিএমএসএমই ও রফতানি খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চট্টগ্রামের শিল্প, পর্যটন ও সামুদ্রিক সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করবে বলে উল্লেখ করা হয়।
ব্লু-ইকোনমির বিকাশে ‘ব্লু ইকোনমি লেন্ডিং গাইডলাইন’ প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় ‘ব্লু ইকোনমি রিফাইন্যান্স স্কিম’ চালু এবং সরকারি সহযোগিতায় সুকুক বন্ডের আদলে ‘ব্লু বন্ড’ ইস্যুর প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
চুয়েট উপাচার্য ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া বলেন, একদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে বিশাল বঙ্গোপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব—এই দুইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম। তাই চট্টগ্রামকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের সভাপতি আবিদা মোস্তফা নারীদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, সফট লোন এবং আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তাব দেন। ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে এফবিসিসিআই সদস্য ও নাহার এগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণ আয়োজনের আহ্বান জানান।
সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ব্যাংকিং, বন্দর, কাস্টমস, রফতানি, কৃষি ও শিল্প খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। জবাবে গভর্নর তাৎক্ষণিক কিছু বিষয়ে সমাধান দেন এবং বাকিগুলো নীতিগতভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর হোসেন সোহেল এবং ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ।