পটিয়ায় কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দাবি নয়, বরং এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, ইতিহাস, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং জনমানুষের প্রত্যাশা বিবেচনায় এটি একটি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক দাবি হিসেবে উঠে এসেছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে পটিয়া বহু আগে থেকেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এই অঞ্চলের গৌরব।
একইভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা প্রখ্যাত পণ্ডিত মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ শান্তিময় খাস্তগীর-এর মতো গুণীজনদের কারণে পটিয়া ঐতিহাসিকভাবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এক সময় এটি মহকুমা শহর হিসেবে প্রশাসনিক গুরুত্বও বহন করেছে।
বর্তমানে পটিয়ায় উপজেলা পর্যায়ের অনেক উন্নত অবকাঠামো বিদ্যমান। সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং সুবিধা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পটিয়া পৌরসভা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে এখনো কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহর কিংবা ঢাকায় যেতে হয়।
এতে করে অর্থনৈতিক চাপ যেমন বাড়ে, তেমনি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় পটিয়ায় একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তা শুধু শিক্ষার সুযোগ বাড়াবে না, বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পভিত্তিক দক্ষতা অর্জন ছাড়া কোনো অঞ্চল টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। পটিয়ায় একটি আধুনিক কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা গেলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকাতেই এসব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলে এর আশপাশে আবাসন, পরিবহন, খাদ্য, বইপত্র, প্রযুক্তি সেবা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার প্রসার ঘটে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, স্থানীয় বাজার চাঙ্গা হয় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ফলে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপ নিতে পারে।
পটিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও এই ক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা। এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে সহজেই যাতায়াত সম্ভব। রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য এটি একটি উপযোগী স্থান হতে পারে।
এছাড়া পটিয়ায় একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সরকারের আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে যেমন উন্নয়ন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তেমনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকেও উন্নয়নের মূলধারায় আনা জরুরি।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, পটিয়ায় একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা নয়—বরং এটি হবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার উদ্যোগ। এটি শিক্ষার প্রসার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এখন সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে এই যৌক্তিক দাবিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার।
লেখক:
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এপেক্স বাংলাদেশ।