আলমগীর আলম,পটিয়া।
স্বামীর দুটি কিডনি অকেজো।
নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে কাটছে তাঁর দিন। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বামীর পরিকল্পনা ও পরামর্শে জৈব সার উৎপাদন করে সফলতার মুখ দেখেছেন পটিয়ার গৃহবধূ রুমা আক্তার।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তিনি প্রতি মাসে আনুমানিক দুই থেকে তিন টন জৈব সার উৎপাদন করছেন। তাঁর উৎপাদিত সার কিনতে স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দূরদূরান্তের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও কৃষকরা আসছেন।
পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ডুয়ারপাড়ায় গড়ে উঠেছে রুমা আক্তারের এই উদ্যোগ।
শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষকদের মধ্যে তাঁর উৎপাদিত জৈব সার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চায় জৈব সারের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর এ উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রুমা আক্তারের স্বামী মোহাম্মদ সোহাফ উদ্দিন একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক।
দীর্ঘদিনের কৃষি অভিজ্ঞতা ও কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি স্ত্রীকে জৈব সার উৎপাদনে উৎসাহিত করেন।
তাঁর পরিকল্পনা ও পরামর্শে রুমা আক্তার এ কাজ শুরু করেন।
ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের কাছেও তাঁর সার পরিচিতি পাচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের এক মানবিক গল্প। সোহাফ উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তাঁর দুটি কিডনি অকেজো হয়ে পড়ায় অধিকাংশ সময় বাড়িতে থাকতে হয়। নিয়মিত রক্তও নিতে হয় তাঁকে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগের মতো মাঠে কাজ করতে না পারলেও কৃষির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্ত্রীকে পরিকল্পনা, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সোহাফ উদ্দিন বলেন, “কৃষি আমাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগের মতো মাঠে কাজ করতে পারি না। তবে কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকেই স্ত্রীকে জৈব সার উৎপাদনে উৎসাহিত করেছি। তিনি এখন নিয়মিত সার উৎপাদন করছেন। কৃষকরা আমাদের উৎপাদিত সার ব্যবহার করে উপকৃত হলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এ উদ্যোগ আরও বড় করার ইচ্ছা রয়েছে।”
রুমা আক্তার বলেন, “স্বামীর পরিকল্পনা ও পরামর্শ এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় জৈব সার উৎপাদন করছি। প্রতি মাসে প্রায় দুই থেকে তিন টন সার উৎপাদন করতে পারছি। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলা থেকেও কৃষকরা সার কিনতে আসছেন। তাঁদের আগ্রহ আমাদের আরও উৎসাহিত করছে।”
তিনি আরও বলেন, পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এ কাজ করতে পেরে ভালো লাগছে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে চান তিনি। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে উদ্যোগটি আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় কৃষক জসিম উদ্দিন জানান, রুমা আক্তারের উৎপাদিত জৈব সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি অন্যান্য এলাকা থেকেও কৃষকরা সার সংগ্রহ করছেন। এ ধরনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের বিকল্প সার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
মাটির স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে জৈব পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জৈব সার মাটির গঠন ও পানি ধারণক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে। তবে ফসলের ধরন, মাটির অবস্থা ও পুষ্টির চাহিদা বিবেচনায় জৈব ও রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রুমা আক্তারের এই উদ্যোগ শুধু জৈব সার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও পারিবারিক স্বাবলম্বিতারও একটি দৃষ্টান্ত। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও স্বামীর অভিজ্ঞতা ও নিজের শ্রমকে কাজে লাগিয়ে তিনি যে উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন, তা অন্য নারীদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁর উদ্যোগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও নিয়মিত সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি উৎপাদিত সারের গুণগত মান যাচাই, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।