দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জনপদ পটিয়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতীয়ভাবেও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে বীর পটিয়ার। এক সময় এটি ছিল সাবেক মহকুমা শহর।
দেশের বিভিন্ন মহকুমা সময়ের প্রয়োজনে জেলায় উন্নীত হলেও নানা অজানা কারণে এখনো জেলা হয়নি পটিয়া। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের একটি প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে—৬৪ জেলার কাতারে পটিয়াকেও জেলা হিসেবে ঘোষণা করা।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে পটিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এ অঞ্চল ছিল বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের একটি শক্ত ঘাঁটি। সে সময়ের সাহসী ভূমিকার কারণে পটিয়া “বীর পটিয়া” নামেও পরিচিতি পায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারে পটিয়ার মানুষের অবদান উল্লেখযোগ্য।
এই অঞ্চলের কৃতি সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন উপমহাদেশের বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যিনি ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে আত্মোৎসর্গ করেন। এছাড়াও প্রখ্যাত পণ্ডিত ও গবেষক মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এবং শিক্ষাবিদ ড. শান্তিময় খাস্তগীর-এর মতো বহু গুণী মানুষের জন্ম এই জনপদে। তাঁদের অবদান পটিয়ার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শুধু ইতিহাস নয়, অবকাঠামোগত দিক থেকেও পটিয়া একটি সম্ভাবনাময় প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানে রয়েছে উন্নত সড়ক যোগাযোগ, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক-বীমা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস এবং জমজমাট বাণিজ্যিক বাজার। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় পটিয়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি অঞ্চলকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষেত্রে যে ধরনের অবকাঠামো, জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তার বেশিরভাগই ইতোমধ্যে পটিয়ায় বিদ্যমান। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তৃত এলাকার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে প্রতিদিন পটিয়ায় আসা-যাওয়া করে। ফলে পটিয়া বাস্তব অর্থেই একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
পটিয়াকে জেলা করার দাবিতে বিভিন্ন সময় স্থানীয় জনগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেছে। মানববন্ধন, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাবিটি তুলে ধরা হয়েছিল। এমনকি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অনেক ধাপ সম্পন্ন হয়েছিল বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
বিজ্ঞমহলের মতে, পটিয়াকে জেলা করার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। অবকাঠামোগতভাবে প্রস্তুত এই জনপদকে জেলা হিসেবে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখা জরুরি। সমন্বিত দাবি এবং সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকলে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে পারে।
অনেকের মতে, পটিয়া জেলা হলে শুধু প্রশাসনিক সুবিধাই বাড়বে না, বরং দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে। নতুন সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং জনগণের সেবা পাওয়া সহজ হবে।
স্থানীয় জনগণের আশা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবকাঠামো এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে একদিন পটিয়াকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হবে। দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে এবং “বীর পটিয়া” নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি জেলা হিসেবে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পটিয়ার মানুষের সেই স্বপ্ন আরও জোরালো হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কবে বাস্তবে রূপ পায় পটিয়াবাসীর বহুদিনের এই দাবি।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের যে কয়টি উপজেলা রয়েছে, তার মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে পটিয়া। এক সময় পটিয়া থেকেই আশপাশের উপজেলার প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া হতো। বৃহত্তর পটিয়াবাসীর আজও একটাই স্বপ্ন—পটিয়াকে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
পটিয়া যদি জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়, তাহলে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক নতুন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হওয়ায় পটিয়া জেলা হলে এর প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়বে। প্রধান কয়েকটি সম্ভাব্য সুবিধা নিচে তুলে ধরা হলো—
১. প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায়
জেলা হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা জজ কোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর স্থাপিত হবে। এতে মানুষকে ছোট ছোট কাজের জন্য চট্টগ্রাম শহরে যেতে হবে না; সময় ও খরচ দুটোই কমবে।
২. উন্নত স্বাস্থ্যসেবা
জেলা হলে সাধারণত ২৫০ শয্যা বা তার বেশি ধারণক্ষমতার জেলা হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা গড়ে ওঠে। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাবে।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ
জেলা হলে নতুন সরকারি কলেজ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নার্সিং ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে।
৪. কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি
জেলা প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংক ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যও বৃদ্ধি পাবে।
৫. অবকাঠামো উন্নয়ন
জেলা সদর হলে সাধারণত নতুন সড়ক, বাস টার্মিনাল, আধুনিক বাজার, আবাসন, অফিস ভবন, পার্কসহ নানা অবকাঠামো গড়ে ওঠে। এতে পুরো এলাকার নগরায়ণ দ্রুত হয়।
৬. শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার
পটিয়া ইতোমধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র। জেলা হলে বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
৭. কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন
জেলা কৃষি অফিস, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কার্যক্রম বাড়বে। কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তা সহজলভ্য হবে।
৮. আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা উন্নতি
জেলা হলে পুলিশ প্রশাসন আরও শক্তিশালী হয়, নতুন থানা বা ফাঁড়ি স্থাপন হয়। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা বাড়ে।
৯. পর্যটন ও ঐতিহ্যের বিকাশ
পটিয়ার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো জেলা হলে নতুনভাবে পরিচিতি পাবে। পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
১০. দক্ষিণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভারসাম্য
চট্টগ্রাম শহরের ওপর চাপ কমবে এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়ন আরও সমন্বিতভাবে এগোবে।
সংক্ষেপে, পটিয়া জেলা হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থনৈতিক গতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
লেখক:
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট