বন্যা হচ্ছে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই দুর্যোগ কিছু অঞ্চলের জন্য প্রতিবছরই অবধারিত। এই বছর বন্যার চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর পানি নামতে শুরু করলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় যে তথ্য দিয়েছে, তাতে বিভিন্ন উপজেলার সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। গত রোববার থেকে টানা পানি নামতে শুরু করেছে। তবে দিনদিন পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। তবে এখন সবচেয়ে বড় সংকটে বিশুদ্ধ পানির। নাই পর্যাপ্ত ত্রাণ তৎপরতাও। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে। রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ডসহ প্লাবিত হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়, শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ১৭৬টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন লোক বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি। বাঁশখালীতে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু, বিলে পড়ে মারা গেছে কিশোরী । চকরিয়ায় উপজেলায় পাহাড় ধসে দুই শিশু,পানিতে ডুবে দুই শিশুসহ চারজন মারা গেছে বন্যায়। এর আগে নগরীতে পাহাড় ও দেয়াল ধসেও মারা গেছে। সাতকানিয়ায় অভ্যন্তরীণ সব সড়ক এখনো পানির নিচে । চন্দনাইশে মাছের প্রজেক্ট ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে এক বোনের মৃত্যু, দুইজন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রামে বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু। অনাহার আর বিশুদ্ধ পানির অভাবে আঁকড়ে ধরছে রোগবালাইও। বন্যা পরিস্থিতি সবার জন্যই ভীতিকর হলেও এ সময় সবার শান্ত থেকে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বন্যা পরবর্তী সময়ে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। যা স্বাস্থ্য সুরক্ষা আর জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্যার সময় এবং বন্যা পরবর্তী সময়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। বন্যার পানি বাড়িতে প্রবেশ করলেই বাড়ির শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, প্রতিবন্ধীদের দ্রুত বন্যামুক্ত নিরাপদ স্থানে কিংবা আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে রেখে আসুন। দলিল, সনদপত্র, লাইসেন্সের মতো প্রয়োজনীয় ও জরুরি কাগজপত্র একাধিক পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে বন্যামুক্ত এলাকায় কোনো আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তির কাছে রাখতে পারেন। বাড়ির উঁচু স্থানেও এসব কাগজ রাখা নিরাপদ নয়। কারণ, যেকোনো সময় বন্যা বড় আকার বাড়তে পারে। পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে। বাড়িতে উঁচু স্থান থাকলে দামি এবং পানিতে নষ্ট হয়ে যাবে এমন প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সেখানে দ্রুত সরিতে রাখতে হবে। উঁচু স্থান না থাকলে একটি উঁচু মাচা তৈরি করতে পারেন। চাইলে বন্যামুক্ত এলাকায় সরিয়ে নিতে পারেন। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও দেয়াল ধস থেকে রক্ষা পেতে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে আসার জন্য সচেতন হওয়া জরুরী। বন্যা মোকাবিলায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য ব্যবহার করা। কারণ, বন্যায় অধিকাংশ রোগই পানি ও খাদ্যবাহিত। তাই বিশুদ্ধ পানি পান করা জরুরি। পানি ছেঁকে কমপক্ষে আধাঘণ্টা ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। এই ব্যবস্থা না থাকলে ফিটকিরি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়েও পানি বিশুদ্ধ করা যায়। এ সময় নোংরা পানি, আবহাওয়া, টানা বৃষ্টির কারণে নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় ডায়রিয়ার প্রকোপ। হাতের কাছে খাবার স্যালাইন রাখুন। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্যাভলন ও ব্যান্ডেজ রাখতে হবে।
বন্যার পানি ধেয়ে আসলে ঘরের সকল বিদ্যুতের সুইচ এবং মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন। এতে বিদ্যুৎ ঘটিত সাম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। দুর্যোগের মধ্যেই রাত কাটাতে হবে। তাই হাতের নাগালে দেশলাই, মোমবাতি, হারিকেন, টর্চ লাইট রাখুন। বন্যার সময় মনোবল শক্ত রাখুন। নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। নিরাপদে থাকুন। জিনিসপত্রের কথা ভেবে ঘরে থেকে যাবেন না। হঠাৎ পানির স্রোত বাড়লে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্পদের চেয়েও জীবনের মূল্য অনেক বেশি। যাতায়াতের জন্য নৌকা হাতের কাছে না পেলে কলার ভেলা ব্যবহার করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ গ্রহণ করুন। তাদের ত্রাণে অভাব মেটানোর চেষ্টা করুন। এমন দুর্যোগে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। সম্পদ রক্ষার্থে এবং বন্যাকবলিত এলাকার নিরাপত্তা রক্ষার্থে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করতে হবে। সে সাথে মানবিক কাজে উৎসাহিত করতে হবে। বন্যার সময় কলেরাসহ বিভিন্ন রোগ থেকেন বাঁচতে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। খাবার খাওয়ার আগে ও পরে, টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। বন্যার সময় পানির নিচে বৈদ্যুতিক টাওয়ার, খুঁটি ও ট্রান্সফরমার লাইনের তার ডুবে যায়। এসব বৈদ্যুতিক লাইনের নিচ দিয়ে নৌকা বা ভেলা চালালে সতর্ক থাকতে হবে। বন্যার সময় বীজতলা গেলে নানানভাবে চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা জানুন। কলাগাছের ভেলা বানিয়ে সেই ভেলার ওপর কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে বীজ ছিটিয়ে দিন। বীজতলায় চারা থাকলে তা মাটিসহ তুলে উঁচু স্থানে নিয়ে যান। প্রাণিসম্পদ উদ্ধার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারেরই জীবন-জীবিকার প্রধান উপায় হচ্ছে গবাদিপশু। বন্যার সময়ে এই প্রাণীসম্পদের ক্ষতি পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের রক্ষার্থে অর্থায়ন কিংবা প্রাণীগুলোর উদ্ধার কাজে সরাসরি যোগদান করা উচিত। এরই ধারাবাহিকতায় পশুর খাদ্য, পশুচিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার প্রসঙ্গও আছে। কেননা এর ওপর বন্যা পরবর্তীতে তাদের সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি নির্ভর করছে। এমনকি অল্প কিছু আর্থিক অনুদানও পরিবারগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সাহায্যে আসতে পারে।
বন্যার শঙ্কা থাকলে গবাদিপশুকে টিকা দিয়ে নিতে হবে। বন্যায় যদি কোনো গবাদিপশুর প্রাণহানি হয়, তবে তাকে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া যাবে না। মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। যাতে দূর্গন্ধ ছড়াতে না পারে। বন্যাদুর্গত অঞ্চলে অপরাধকর্ম ও সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় সরকার, উপজেলা প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বন্যার চাইতে বন্যা পরবর্তী সময়টাই সবচেয়ে কঠিন সময়। তাই সে সময়ে সরকারী বেসরকারী নিদের্শনা মেনে চলতে হবে। তারা অনুমতি দিলেই বা নিরাপদ বলার পরেই বাড়ি ফিরতে হবে। একটি সারভাইভাল কিট প্যাক করুন। সেখানে কমপক্ষে তিন দিনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানি নিন। প্রত্যেকের জন্য একটি করে পোশাক, প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখুন। জরুরি তথ্যের জন্য রেডিও, স্থানীয় পরিবর্তনকারী সিস্টেম বা সরকারী নির্দেশাবলী শুনুন। বন্যা পরবর্তী সময়ে বন্যার পানিতে হাঁটবেন না, সাঁতার কাটবেন না বা গাড়ি চালাবেন না। কারণ ৬ ইঞ্চি পানির স্তরেও আপনি নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। বাড়িতে ঢোকার আগে দেখে নিন কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে কি না। ভেজা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকুন, এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র পরিদর্শন করার আগে পাওয়ার চালু করবেন না।সাপ ও বিভিন্ন প্রাণী আপনার বাড়িতে থাকতে পারে, তাই সতর্ক থাকুন। সম্ভব হলে গ্লাভস ও বুট পরুন। বন্যার সময় সাপে কাটলে বিষটাকে নিষ্ক্রিয় করতে অ্যান্টিভেনম ওষুধ দিতে হবে। এগুলো বন্যা উপদ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে মজুদ রাখতে হবে। সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে গেলে তারা কি ব্যবস্থা নিবে, সেজন্য ডাক্তার এবং নার্সদের গাইডলাইন তৈরি করে দিতে হবে এবং প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় জরুরি টিম গঠন করতে হবে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন টিমে যারা থাকবেন, তাদের এসব বিষয় খেয়াল রাখতে বে, তদারকি করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ত্রাণ বিতরণ, সামাজিক ও আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠান মেরামত, বিভিন্ন অবকাঠামো পুনরায় নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে বিনামূল্যে কৃষিবীজ বিতরণ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করার জন্য সরকারের পাশাপশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যা-দূষিত প্রতিটি ঘর পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চন্দনাইশ সিভিল সোসাইটি।