নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী শিয়ালিয়া পাড়ায় সংরক্ষিত পাহাড়ি বনভূমি দখল করে অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগে জসিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে বলে জানান বন বিভাগ। মামলার বিষয়টি থাইংখালী বনবিট কর্মকর্তা আরাফাত মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে এবং অবৈধ অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সরকারি বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে প্রশাসনের নজরে আসে এবং পরে বন বিভাগ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে কাজ বন্ধ করে দেয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী শিয়ালিয়া পাড়ায় সংরক্ষিত পাহাড়ি বনভূমির একটি অংশে অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল।বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের পর এবং সংবাদ প্রকাশিত হলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান।সেখানে গিয়ে তারা জমির মালিকানা,রেকর্ড,খতিয়ান এবং দখল সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই-বাছাই করেন।তবে অভিযুক্ত পক্ষ জমির মালিকানা দাবি করলেও কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি বলে বন বিভাগ জানিয়েছে।এ অবস্থায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে বন আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ,অভিযুক্ত জসিম উদ্দিন পিতা মৃত ইয়াকুব আলী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।তিনি স্থানীয় আওয়ামী একটি রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।এলাকাবাসীর দাবি,দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল।এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে,থাইংখালী বনবিট কর্মকর্তা আরাফাত মাহমুদকে ম্যানেজ করে জসিম উদ্দিন নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অভিযুক্ত জসিম উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার ওই কর্মকর্তাকে বালুখালী পানবাজার এলাকায় দেখা গেছে। এমনকি স্থানীয় একটি জুসের দোকানে বসে তাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে,পালংখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজল কাদের ভুট্টোর চাচাতো ভাই হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন জসিম উদ্দিন। তিনি নিজেকে যুবলীগের নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব খাটান বলেও অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, তার কোনো দৃশ্যমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও তিনি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে,জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহার করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত।স্থানীয়দের দাবি,মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান এনে তা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রবেশ করানো হয় এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হয়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, জসিম উদ্দিন রাতারাতি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন এবং এর পেছনে মাদক বাণিজ্যের অর্থই মূল উৎস বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মাদক সংক্রান্ত মামলাও রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগই কার্যকরভাবে তদন্তের মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে থাইংখালী বনবিট কর্মকর্তা আরাফাত মাহমুদ বলেন, সংরক্ষিত বনভূমিতে অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ এবং আইন অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জমির মালিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে। অভিযুক্ত পক্ষ কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় বন আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলেছেন, উখিয়া অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং এলাকার প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের অবৈধ স্থাপনা আশপাশের জনবসতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতীতে কক্সবাজার অঞ্চলে পাহাড় ধসে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের কারণে বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটার মতো কর্মকাণ্ড দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
পালংখালী ইউনিয়নের অনেক বাসিন্দা বলেছেন, প্রশাসনের এই আইনি পদক্ষেপে তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে তারা চান তদন্ত দ্রুত শেষ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর সংরক্ষিত বনভূমি দখল বা পাহাড় কেটে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সাহস না পায়।
এদিকে অভিযুক্ত জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।