বোয়ালখালী প্রতিনিধি:
সকালের সূর্য যখন ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে উঠতে শুরু করে, তখন বোয়ালখালীর পূর্ব আমুচিয়া গ্রামের মাঠে শুরু হয় এক নীরব উৎসব। শিশিরভেজা সবুজ প্রান্তরের মাঝখানে সারি সারি সূর্যমুখী যেন একসঙ্গে মুখ তুলে তাকায় আলোর দিকে। বসন্তের মৃদু হাওয়ায় দুলতে দুলতে তারা যেন ঘোষণা দেয়—এবারের গল্প শুধু সৌন্দর্যের নয়, সম্ভাবনারও।
এই হলুদ সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলছিলেন কৃষক মো. এস এম বাবর। জীবনে প্রথমবারের মতো এক একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন তিনি। আগে দূর থেকে সূর্যমুখীর ক্ষেত দেখে ভালো লাগলেও কখনও ভাবেননি নিজের জমিতে এমন দৃশ্য ফুটে উঠবে।
“শুরুতে অনেকে বলেছিল, সূর্যমুখী তো শুধু দেখার জন্য। লাভ কই?”—বলছিলেন বাবর। “কিন্তু কৃষি অফিসের পরামর্শে জানলাম, এর বীজ থেকে তেল হয়, আর বাজারেও ভালো দাম। তখন সাহস করে চাষ শুরু করি।”
জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, সেচ ও পরিচর্যা—সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে এখন মাঠের দিকে তাকালেই তার চোখে ভেসে ওঠে সম্ভাবনার ছবি। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ৪০ শতক জমি থেকে প্রায় পাঁচ মন সূর্যমুখীর বীজ পাওয়া যায়। সে হিসেবে এক একর জমি থেকে প্রায় সাড়ে ১২ মন বীজ মিলতে পারে। বর্তমান বাজারদরে সেই বীজ থেকে উৎপাদিত তেলের মূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। খরচ বাদ দিলে ভালো লাভের আশা করছেন বাবর।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শাহানুর ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে সরকারি প্রণোদনার আওতায় দুই হেক্টর জমিতে বিনামূল্যে সূর্যমুখীর বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সূর্যমুখী চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক পরিচর্যা করলে কৃষকরা ভালো ফলন ও লাভ পাবেন।”
বিকেলের দিকে সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখনও সূর্যমুখীগুলো যেন আলোকে অনুসরণ করে শেষ বিদায় জানায়। সেই দৃশ্য দেখতে অনেক পথচারী থমকে দাঁড়ান, কেউ কেউ ছবি তোলেন, কেউ আবার নতুন করে ভাবেন—নিজের জমিতেও কি এমন হলুদ স্বপ্ন ফুটতে পারে না?
বোয়ালখালীর এই বসন্ত তাই শুধু প্রকৃতির রঙিন আয়োজন নয়; এটি এক কৃষকের সাহস, শ্রম আর আশার গল্প। সূর্যের দিকে মুখ তুলে থাকা সূর্যমুখীর মতোই বাবরের চোখেও এখন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলো।