বায়েজিদের অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসী হত্যাকারী গলাকাটা বাচা আবারো সক্রিয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম মহানগর ও পার্শ্ববর্তী সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অপরাধ পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়ভাবে বহুল আলোচিত সাদ্দাম হোসেন ওরফে “গলাকাটা বাচা” নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছে, যা বর্তমানে এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ভূমি দখলসহ নানা অপরাধে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বহুদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে স্থানীয় জনপদে।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগ অনুযায়ী, সাদ্দাম হোসেন বাচার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানায় ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে একাধিক হত্যা ও ডাবল হত্যার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে একাধিকবার গ্রেফতার হলেও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন জটিলতা ও ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তিনি আবারও জামিনে বের হয়ে পূর্বের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ফলে তার বিরুদ্ধে জনমনে এক ধরনের ভীতি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
পুলিশি নথি, এজাহার ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে দাঙ্গা, হামলা, অস্ত্র ব্যবহার, হত্যাচেষ্টা, হত্যা, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২১, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হলেও এসব মামলার বেশিরভাগই এখনো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাদ্দাম হোসেন বাচা কেবল এককভাবে নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নেতৃত্ব দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তার সহযোগীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই চক্রটি বিশেষ করে রাতের বেলায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং অস্ত্র প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেকেই দাবি করেন, তাদের চলাফেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও এই চক্রের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। এই গলাকাটা বাচা বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকার বাংলাবাজার ডেবার পাড় স্থানে বসবাস করেন।
এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি ও ভিডিও নিয়েও ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। এসব ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। যদিও এসব অস্ত্র তার কাছে থাকা কখনো প্রশাসন উদ্ধার করতে পারেননি, যদিও সে একাধিক তার গ্রেপ্তার হয়েছে,তবুও এগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশকে আরও তীব্র করেছে।
বিশেষ করে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে অপরাধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। এই এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার পরিবার বসবাস করে এবং কয়েক লক্ষাধিক মানুষ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দিনের বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও রাত নামলেই বেড়ে যায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা, অস্ত্রের মহড়া ও ভয়ভীতি প্রদর্শন যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি শক্তিশালী অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। এই চক্রের সাথে সাদ্দাম হোসেন বাচার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। তারা বলেন, এই চক্রটি শুধু অপরাধেই জড়িত নয়, বরং ভূমি দখল ও অবৈধ প্লট বিক্রির মতো কার্যক্রমের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। এসব সরকারি পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য করে সন্ত্রাসী লালন পালন ও অস্ত্রের মজুদ করেছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এইসব সন্ত্রাসীদের বর্তমান যোগানদাতা এই গলাকাটা বাচা। তার সাথে রয়েছে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের গভীর সম্পর্ক। বর্তমানে এই সকল সন্ত্রাসীরা প্রশাসন থেকে নিজেদের আড়াল করে আশ্রয় নিয়েছে এই গলাকাটা বাচার স্থানে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি পাহাড় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অবৈধভাবে দখল করে প্লট তৈরি এবং বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে অপরাধচক্রের আর্থিক শক্তি বাড়ছে। ভূমিদস্যুতা এই অঞ্চলের একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেন সচেতন মহল।
একইসাথে এলাকায় মাদক ব্যবসার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সহজলভ্য মাদকের কারণে তরুণ সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, এই সাদ্দাম হোসেন বাচা খুব ভয়ানক“আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। কখন কী হয় বলা যায় না। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।” আরেকজন বলেন, “প্রতিদিন কোনো না কোনো ঘটনা ঘটাচ্ছে গলাকাটা বাচা, কিন্তু ভয়ের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”। বায়েজিদ ও সলিমপুরের অনেকেই বলছেন প্রশাসনের বেশ কয়েকটি ক্যাম্প আরো তৈরি হওয়ার দরকার না হয় এসব সন্ত্রাসীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়া এত সহজ হবে না । এইসব সন্ত্রাসীদের রয়েছে আজেবাজে বেশ কয়েকটি ফেসবুক আইডি যা প্রতিনিয়ত গুজব রটানো তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের অভিযানে এইসব সন্ত্রাসীরা এক্কেবারে দিশাহারা হয়ে বিভিন্ন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাই এসব সন্ত্রাসীরা দিক বেদিক খোঁজে না পেয়ে বর্তমানে আজেবাজে ফেসবুক আইডি খুলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব সন্ত্রাসীদের নেই কোন পরিবার না আছে ভালো ফ্যামিলির পরিচয়। তাদের কাজ হল সন্ত্রাসী ও মানুষকে নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য বিভ্রান্তিকর সৃষ্টি করা।
স্থানীয়দের মতে, সাদ্দাম হোসেন বাচা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে তাকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে অনেক ভুক্তভোগী থাকলেও তারা আইনের আশ্রয় নিতে সাহস পান না। এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
এদিকে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বর্তমানে প্রশাসনের কয়েকটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে এখনো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনের ক্যাম্পের আশপাশেও পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ এলাকা হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে। তবে তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, ধাপে ধাপে অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মামলায় দাঙ্গা, হামলা, সরকারি কাজে বাধা প্রদানসহ একাধিক ধারায় অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পৃথক মামলায় হত্যা, সহিংসতা, চুরি, হুমকি এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব মামলায় বহু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই ধরনের অপরাধ পরিস্থিতি একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনা, অপরাধচক্র শনাক্তকরণ এবং কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধুমাত্র সাময়িক পদক্ষেপ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশ ও প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে, সাদ্দাম হোসেন ওরফে গলাকাটা বাচাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং বায়েজিদ সীতাকুণ্ডসহ আশপাশের এলাকার সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতি এখন স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা দ্রুত, কার্যকর এবং নিরপেক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।