নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, গুরুতর জখম এবং পরবর্তীতে মামলা দায়েরের পরও আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর দাবি,এ ধরনের ঘটনা যদি দৃষ্টান্তমূলকভাবে দমন করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী জানা যায়, গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখ দুপুর আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে শেরশাহ তারা গেইট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন মোড় এলাকায় পরিকল্পিতভাবে এই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগকারী মোঃ মামুন হোসেন (৪৩), যিনি দীর্ঘদিন ধরে স্ক্র্যাপ ও গার্মেন্টস জুট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, জানান গার্মেন্টসের জুট কাপড় সরবরাহকে কেন্দ্র করে অভিযুক্তদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
তিনি জানান, একটি নির্দিষ্ট গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান থেকে জুট কাপড় সরবরাহ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই জুটের কাপড় তাদের না দিয়ে অভিযুক্তদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তিনি প্রতিবাদ করেন। পরবর্তীতে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষকে সমন্বয়ের জন্য আলোচনার আহ্বান জানায়।
এই প্রেক্ষাপটে ঘটনার দিন মামুন হোসেন তার সহযোগী ব্যবসায়ী ইউনুছ ফকির (৫৩), মোঃ সাদ্দাম (৩৫), মোঃ মাসুদ (২৮), মোঃ ইয়াছিন (২৬) ও মোঃ মনির (৩৫)-কে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে পৌঁছানোর পর অভিযুক্তরা তাদের সাথে প্রথমে তর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং পরে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, মাহবুবুল আলম শিপন, জাহাঙ্গীর আলম বাবু, আব্দুর রশিদ টিটু, মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, মোঃ রাশেদসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০-৩০ জন সংঘবদ্ধ হয়ে ধারালো দা, কিরিচ, ছুরি, লোহার রড, স্টিল পাইপ ও লাঠিসোটা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং আক্রমণকারীরা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ছিল।
হামলার শুরুতেই ইউনুছ ফকিরকে লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়। একটি স্টিল পাইপ দিয়ে তার মাথায় আঘাত করলে তিনি হাত দিয়ে প্রতিহত করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। এতে তার ডান হাতের হাড় ভেঙে যায় এবং বাম হাতের আঙুলেও মারাত্মক জখম হয়। এরপর তাকে মাটিতে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়।
তারপর অন্যান্য ব্যবসায়ীরা তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। মোঃ সাদ্দাম, মোঃ মাসুদ ও মোঃ ইয়াছিন গুরুতরভাবে আহত হন। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে যাওয়া, আঘাতের চিহ্ন ও অভ্যন্তরীণ আঘাতের অভিযোগ পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন হামলাকারীরা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং আশপাশের লোকজন আতঙ্কে দৌড়ে পালাতে থাকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে পড়ে।
এ সময় হামলাকারীরা ভুক্তভোগীদের উদ্দেশ্যে প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে এবং বলে, “কোনো মামলা করলে বা বিষয়টি প্রকাশ করলে আরও বড় ক্ষতি করা হবে।” এতে ভুক্তভোগীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। গুরুতর আহত ইউনুছ ফকিরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তার ডান হাতের হাড় দুই টুকরা হয়ে গেছে এবং অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। অন্য আহতদের স্থানীয় ফার্মেসি ও ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার দুই দিন পর, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা নং-৪৪ দায়ের করা হয়। মামলাটি দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৩০৭/৩২৫/১৪৩/৩৪১/৩২৩/৫০৬ ধারাসহ Explosive Substances Act, 1908 এর ৪/৫ ধারায় রুজু করা হয়েছে।
তবে মামলার পরও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী। তিনি অভিযোগ করেন, “চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি থানার আশপাশেও তাদের দেখা যায়। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।”
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তরা ‘লাল বাদশা’ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য এবং এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার বাদী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আমি যেকোনো সময় হামলার শিকার হতে পারি। আমার জীবন এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমি বাঁচতে চাই, আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাই।”
এলাকাবাসী জানান, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে শেরশাহ, জামতলা, কলোনী এলাকা ও আশপাশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও দখলবাজির ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনলে এ ধরনের অপরাধ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং জনমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা কমে যাবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী। তাদের দাবি,অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সহিংস ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমরা ন্যায়বিচার চাই, নিরাপত্তা চাই। রাষ্ট্রের আইন যদি আমাদের রক্ষা না করে, তাহলে আমরা কোথায় যাব?”