চট্টগ্রাম দক্ষিণের পটিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীসহ বিস্তীর্ণ জনপদে নীরবে গভীর সংকট দানা বেঁধেছে। সাম্প্রতিক সময়ে Islami Bank Bangladesh PLC-সহ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে গণহারে চাকরিচ্যুতির ঘটনায় প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি তরুণ কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
হঠাৎ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিপর্যয়।
যাঁরা এক সময় ব্যাংকের দায়িত্বশীল পদে কর্মরত ছিলেন, নিয়মিত বেতন পেতেন, পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতেন, আজ তাঁদের অনেকেই ঘরে বসে দিন গুনছেন।
নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত।
ব্যাংক খাতে নিয়োগ কার্যত স্থবির।
বয়স, অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে অনেকের পক্ষে অন্য পেশায় হঠাৎ মানিয়ে নেওয়া এবং সাটিফিকেটের মেয়াদ উত্তির্ন হওয়ায় চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে একের পর এক পরিবার পড়ে যাচ্ছে আর্থিক সংকটে।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, চাকরি হারানোদের অনেকেই গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ বা গাড়ি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন।
মাস শেষে বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুল-কলেজের ফি, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার খরচ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। একসময় যাঁরা আত্মীয়-স্বজনের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন, আজ তাঁরাই আত্মসম্মানবোধের কারণে কারও কাছে হাত পাততে পারছেন না।
ভিতরে ভিতরে জমছে হতাশা।
সংসারে বাড়ছে কলহ। আর্থিক টানাপোড়েন থেকে জন্ম নিচ্ছে ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস ও মানসিক দূরত্ব। বিভিন্ন এলাকায় এমন ঘটনাও ঘটছে যেখানে স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ বছরের সংসার ভেঙে যাচ্ছে অভাবের চাপে।
পটিয়ার এক ব্যাংকারের ঘটনা এখন মানুষের মুখে মুখে।
চাকরি হারানোর পর দীর্ঘ ১৪ বছরের দাম্পত্য টিকিয়ে রাখতে পারেননি তিনি।
চরম অর্থকষ্টে তাঁর স্ত্রী ১৩ বছরের কন্যা ও ৬ বছরের পুত্রকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিবেশীরা জানান, এক সময় যে পরিবারে স্বপ্ন আর স্থিতি ছিল, আজ সেখানে নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাস।
অনেকেই বলছেন, হঠাৎ চাকরি হারানো শুধু আর্থিক সংকট তৈরি করে না, এটি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক পরিচয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।
অনেকেই বিষণ্নতা, অনিদ্রা ও উদ্বেগে ভুগছেন।
কারও কারও মধ্যে আত্মগোপন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকে। পরিবারেও স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা, কেনাকাটায় স্থবিরতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিক্রি কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশের ক্রয়ক্ষমতা হঠাৎ কমে গেছে। এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো সমাজে।
এ অবস্থায় সচেতন মহল দ্রুত সরকারি ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বহাল, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বল্পসুদে পুনর্বাসন ঋণ, কিংবা বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠনের মতো উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের অন্তত পর্যায়ক্রমে কাজে ফেরানোর ব্যবস্থা নিতে।
একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন তার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী স্থিতিশীল থাকে। হাজারো শিক্ষিত, দক্ষ তরুণ যদি অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হন, তবে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই নীরব আর্তনাদ যেন আর উপেক্ষিত না থাকে। মানবিক বিবেচনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন। সময়মতো সহায়তার হাত বাড়ানো না হলে, এই সংকট আরও গভীর হয়ে এক অদৃশ্য দুর্ভিক্ষে রূপ নিতে পারে—যার ক্ষত বহন করতে হবে বহু বছর।
লেখক:
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।