বিশ্ব রাজনীতি যখন এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব, পরাশক্তির কূটনৈতিক চাপ এবং চলমান সামরিক প্রস্তুতি মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইরান'কে ঘিরে উত্তেজনা, ইসরায়েল এর সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং যুক্তরাষ্ট্রেরর সক্রিয় কৌশলগত উপস্থিতি এমন এক সমীকরণ তৈরি করেছে, যা আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বহু দশক ধরে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ফিলিস্তিন সমস্যা, সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, ইয়েমেন সংকট, সব মিলিয়ে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন অগ্নিগর্ভ। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার তাৎপর্য হলো, এটি সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আর এর অভিঘাত হবে বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী।
অর্থনৈতিক অভিঘাত: তৃতীয় বিশ্বের প্রধান শঙ্কা :
যুদ্ধের প্রথম ও সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর, যারা আমদানি-নির্ভর জ্বালানি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ঘটবে। ফলস্বরূপ জনজীবনে চাপ বাড়বে, আর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও ঋণের চাপে জর্জরিত। নতুন করে জ্বালানি ধাক্কা তাদের আর্থিক ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
প্রবাসী শ্রমিক ও রেমিট্যান্স ঝুঁকি :
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক তৃতীয় বিশ্বের মানুষ কর্মরত। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তাদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে। অতীতে দেখা গেছে, আঞ্চলিক সংঘাতে বিদেশি শ্রমিকদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রয়োজন হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। বর্তমান বাস্তবতায় সেই আশঙ্কা আরও তীব্র।
খাদ্য নিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খল :
যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকেও ভেঙে দেয়। মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয়। সংঘাত তীব্র হলে নৌপথে ঝুঁকি বাড়বে, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে। খাদ্যশস্য, সার ও প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুত মূল্যস্ফীতি ও সংকট দেখা দিতে পারে।
ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ :
বড় শক্তিগুলো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে, নতুন করে জোট রাজনীতি সক্রিয় হবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তখন কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে। একদিকে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অন্যদিকে কৌশলগত সম্পর্ক, এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
খামেনী নিহত ও বিশ্ব শান্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ :
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে আলী খামেনী নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি দেশব্যাপী ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কতটা বিস্ফোরণপ্রবণ এবং একটি সংঘাত কত দ্রুত আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে, যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না। যুদ্ধের আগুনে পুড়ে যায় শুধু সীমান্ত নয়, পুড়ে যায় মানুষের স্বপ্ন, প্রজন্মের সম্ভাবনা, একটি অঞ্চলের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। যখন বোমার শব্দ আকাশ বিদীর্ণ করে, তখন সবচেয়ে বেশি কাঁদে সাধারণ মানুষ, শিশু, নারী, শ্রমিক, প্রবাসী এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যদি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার অভিঘাত সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যসংকট, রেমিট্যান্স হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি- এসবের ভার বহন করতে হবে সেইসব মানুষকে, যারা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক সংকটের চাপে ন্যুব্জ। যুদ্ধের দাম পরিশোধ করে সাধারণ মানুষ; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
এই সংকটময় সময়ে প্রয়োজন সংযম, সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা। শক্তির প্রদর্শন সাময়িক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ক্ষতই বাড়ায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া, উত্তেজনা প্রশমনে যৌথ ভূমিকা রাখা এবং মানবিক সহায়তার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
আজ বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি আবারও ধ্বংসের ইতিহাস লিখবো, নাকি সহমর্মিতা ও মানবতার নতুন অধ্যায় রচনা করবো? মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যদি আবার ধোঁয়া ওঠে, তার ছায়া পড়বে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার প্রান্তিক মানুষের ঘরেও। তাই শান্তির আহ্বান কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি মানবতার দাবি।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয় - মানবিকতার জয় হোক। প্রতিশোধের ভাষা নয়, সংলাপের পথ বেছে নেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় না কোনো অস্ত্র; বিজয়ী হয় শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবতার শক্তি।
লেখক পরিচিতি : কলাম লেখক ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।