একসময় প্লাস্টিককে আধুনিক সভ্যতার অন্যতম আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সহজলভ্যতা, কম খরচ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই প্লাস্টিকই আজ মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক নীরব বৈশ্বিক সংকটের নাম। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, শুধু নদী-সমুদ্র বা বাতাসেই নয়, প্রতিদিনের ব্যবহৃত টুথপেস্ট, বোতলজাত পানি, প্লাস্টিকের খাদ্যপাত্র, বাজারের প্লাস্টিক জার, এমনকি রান্নাঘরের বিভিন্ন প্লাস্টিক সামগ্রী থেকেও অসংখ্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবদেহে প্রবেশ করছে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলোকেই বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক।
সম্প্রতি বাংলাদেশেও মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ESDO)-এর এক বছরের গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনার মধ্যে ২৬টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের বাজারে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তের প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যা জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার এবং পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে এ গবেষণার পর বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এর চেয়েও ক্ষুদ্র কণাকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক। বিজ্ঞানীদের মতে, এসব অতিক্ষুদ্র কণা মানবদেহের কোষ, রক্তপ্রবাহ এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রবেশ করতে সক্ষম, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। অতীতে দাঁত পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করার জন্য কিছু টুথপেস্টে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র দানা বা মাইক্রোবিড ব্যবহার করা হতো। যদিও বহু দেশ ইতোমধ্যে এ ধরনের উপাদান নিষিদ্ধ করেছে, তবুও বিভিন্ন গবেষণায় কিছু পণ্যে এখনও প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। দাঁত ব্রাশ করার সময় এসব কণার একটি অংশ মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে, আর অবশিষ্ট অংশ নর্দমা হয়ে নদী-সমুদ্রের পরিবেশকে দূষিত করে।
শুধু টুথপেস্টই নয়, বোতলজাত পানিও এখন উদ্বেগের একটি বড় কারণ। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সাধারণ এক লিটারের প্লাস্টিক বোতলজাত পানিতে হাজার হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক কণা থাকতে পারে। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে প্লাস্টিকের ক্ষয়ের ফলে এসব কণা পানিতে মিশে যেতে পারে।
একইভাবে বাজারে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের জার, খাবারের বক্স, তেলের বোতল, মসলার পাত্র কিংবা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ ও প্লেট থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে গরম বা তেলযুক্ত খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ব্যবহার, সূর্যের তাপ এবং বারবার ধোয়ার কারণে প্লাস্টিকের ক্ষয় দ্রুত ঘটে এবং ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাদ্যে মিশে যেতে পারে।
ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এবং এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান, তবুও বিভিন্ন গবেষণায় সম্ভাব্য কয়েকটি ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন, প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব, হৃদ্রোগ ও বিপাকীয় জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। তবে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, পরিবেশে প্লাস্টিক দূষণ কমানো, নিরাপদ পানির মান নিশ্চিত করা এবং এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। অর্থাৎ, অযথা আতঙ্ক নয়; প্রয়োজন সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ অভ্যাস আমাদের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। অপ্রয়োজনে বোতলজাত পানি ব্যবহার না করা, প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা, পুরোনো বা আঁচড়যুক্ত প্লাস্টিকের জার পরিবর্তন করা, মাইক্রোবিডমুক্ত ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পণ্য ব্যবহার করা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা—এসব পদক্ষেপ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য সংরক্ষণে নিম্নমানের প্লাস্টিকের ব্যবহার, অতিরিক্ত বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরতা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই সরকারের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারি, উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির অপব্যবহার যেন মানবসভ্যতার জন্য নতুন সংকট ডেকে না আনে। মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। তাই আজই সচেতন হওয়া, প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ বিকল্প গ্রহণ করা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, বরং আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার। আজকের সচেতনতাই পারে আগামী দিনের সুস্থ, নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও সংগঠক; ভাইস প্রেসিডেন্ট, লায়ন্