আমাদের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে সুফি দর্শন ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রসারে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন হজরত কবি সুফি ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি সুফি সাধক, ফার্সি ভাষার কবি এবং রাসুলপ্রেমিক (আশেকে রাসুল)। তাঁর কাব্য, আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং জীবনদর্শন বাংলার সুফি সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। তাঁর উপাধি ছিল ‘রসুলনোমা’, যা তাঁর জীবনের মূল পরিচয় বহন করে—রাসুলে খোদা (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভক্তি।
জন্ম ও জীবনপথ: হজরত সুফি ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.) ১৮শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়ার ঐতিহ্যবাহী মল্লিক সোয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ( বর্তমান বার আউলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পূর্বপাশে)। তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামের বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেন বিশিষ্ট দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতা, বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য মজলুম মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.)।
শৈশব থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা ও সাধনাপ্রবণ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চিশতিয়া তরিকার একজন গুরুত্বপূর্ণ পীর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর সমগ্র জীবন আল্লাহপ্রেম, রাসুলপ্রেম, আত্মশুদ্ধি এবং মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুফিবাদের মূল শিক্ষা অনুযায়ী, তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে তার আত্মার মধ্যে; আর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেই আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন সম্ভব।
দিওয়ানে ওয়াসী: এক কালজয়ী গ্রন্থ: সুফি ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি হলো ফার্সি ভাষায় রচিত “দিওয়ানে ওয়াসী”। এ গ্রন্থে তিনি রাসুল (সা.)-এর প্রতি গভীর ভক্তি ও ভালোবাসাকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আত্মশুদ্ধি, মানবকল্যাণ ও মরমি দর্শনের সুর এতে প্রতিফলিত হয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থ সুফি সাহিত্য ও গবেষণার ক্ষেত্রে আজও একটি মূল্যবান দলিল। এর বহু কবিতা বাংলা, উর্দু, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রতিটি শ্লোকে ধ্বনিত হয়েছে রাসুল প্রেম, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং মানবতার প্রতি সহমর্মিতা।
সুফি দর্শন ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা: হজরত ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.) তাঁর মুরীদ ও অনুসারীদের জন্য আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য এবং সৎ জীবনযাপনের শিক্ষা প্রচার করতেন। তাঁর দর্শনের মূলভিত্তি ছিল—
১. আত্মশুদ্ধি: মন্দ অভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত করে নৈতিক উৎকর্ষ অর্জন।
২. ধৈর্য ও সহনশীলতা: পার্থিব লোভ থেকে বিরত থেকে আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন।
৩. মানবসেবা: মানুষকে ভালোবাসা, দানশীলতা এবং সহানুভূতির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের প্রেরণার উৎস ছিলেন তাঁর মহান মুরশিদ, সুফি সাধক ও যোদ্ধা, বঙ্গের শাহখ্যাত হযরত শাহসুফি নুর মোহাম্মদ নিজামপুরি (রহ.)।
সমাজে প্রভাব: সুফিবাদ তৎকালীন সমাজে মানুষের আত্মিক দিককে উজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.) সাধারণ মানুষকে সহজ-সরল ভাষায় ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষা ব্যাখ্যা করতেন। তাঁর কথামালা মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে উৎসাহিত করত। ফলে তিনি বিপুলসংখ্যক অনুসারী অর্জন করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত সুফি সাধক, ‘দাদা হুজুর’ খ্যাত হযরত শাহসুফি আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) ছিলেন তাঁর একজন খলিফা। এর মাধ্যমে তাঁর সুফি শিক্ষা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তার লাভ করে।
মাজার ও চিরস্মরণীয়তা: ওফাতের পর হজরত সুফি ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)-এর মাজার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মানিকতলা মুন্সি লেনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পবিত্র স্থান আজও অসংখ্য ভক্ত ও অনুসারীর মিলনকেন্দ্র। মানুষ এখানে এসে তাঁর আধ্যাত্মিক দীক্ষার আলোয় নিজেদের জীবনকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করে।হজরত সুফি ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.) ছিলেন একাধারে কবি, সাধক এবং মহান আশেকে রাসুল। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকীর্তি শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষার দলিল নয়, বরং মানবতা ও ভালোবাসার এক অনন্ত আলোকবর্তিকা। তাঁর রচিত “দিওয়ানে ওয়াসী” কেবল কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি রাসুলপ্রেম, আত্মশুদ্ধি ও মরমি দর্শনের এক অমূল্য দলিল।
তাঁর শিক্ষা আজও অনুসারীদের অনুপ্রেরণা জোগায়—মানবপ্রেম, শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে চলার জন্য। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চতম মর্যাদা দান করুন। আমীন।
লেখক: সভাপতি, মুসলমান ইতিহাস সমিতি, সম্পাদক, বিশ্ব ইতিহাস পরিক্রমা ২০২৪/২৫