গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু যখন যুক্তির পরিবর্তে পরিচয়, মতের পরিবর্তে অপবাদ এবং সংলাপের পরিবর্তে বিভাজন প্রাধান্য পায়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিশ্বের বহু দেশে যে প্রবণতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে, তা হলো ‘ট্যাগিং সংস্কৃতি’। এটি এমন একটি রাজনৈতিক আচরণ, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে তার বক্তব্য, কাজ বা অবস্থানের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন না করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়।
ট্যাগিং সংস্কৃতি নতুন কোনো বিষয় নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মতাদর্শিক সংঘাত কিংবা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন পরিচয়ে আখ্যায়িত করার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশ এই সংস্কৃতিকে বহুগুণে বিস্তৃত করেছে। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে একটি বক্তব্য অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়, আর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের আগেই বক্তার ওপর রাজনৈতিক পরিচয়ের ট্যাগ বসিয়ে দেওয়া হয়।
ট্যাগিং সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—ব্যক্তিকে তার পরিচয়ের মাধ্যমে বিচার করা, তার যুক্তিকে নয়। কেউ সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে তাকে একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়; আবার একই ব্যক্তি অন্য কোনো বিষয়ে সরকারের প্রশংসা করলে তার ওপর সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ের ট্যাগ আরোপ করা হয়। অর্থাৎ অবস্থানের পরিবর্তে লেবেলই হয়ে ওঠে বিচার করার প্রধান মানদণ্ড। এর ফলে জনপরিসরে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়। অনেকেই আশঙ্কা করেন, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করলে তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের লোক হিসেবে পরিচিত হবেন। ফলে লেখক, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী কিংবা সাধারণ নাগরিক—অনেকেই আত্মসংযমের পথ অবলম্বন করেন। এটি মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং গণতান্ত্রিক বিতর্কের জন্য অশুভ লক্ষণ।
ট্যাগিং সংস্কৃতি সামাজিক সম্প্রীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে পরিবার, বন্ধুত্ব, পেশাজীবী সমাজ, এমনকি নাগরিক সম্পর্কেও বিভাজন সৃষ্টি হয়। মতের পার্থক্যকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে। ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও ঐকমত্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক দলগুলোরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতা থাকবে, আলোচনা-সমালোচনা থাকবে, মতপার্থক্যও থাকবে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে অমানবিক, দেশবিরোধী বা শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্যই কল্যাণকর নয়। কারণ আজ যে ভাষা অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, কাল সেটিই অন্য পক্ষের হাতিয়ার হয়ে ফিরে আসতে পারে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনে নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল ভাষার ব্যবহার ট্যাগিং সংস্কৃতি কমাতে সহায়তা করতে পারে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও তথ্য যাচাই ছাড়া কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ে আক্রমণ বা অপপ্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক ভাষা পরিহার করাও জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তাশীলতা, মুক্তবুদ্ধির বিতর্কচর্চা, মননশীল গ্রন্থপাঠ, নাগরিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও উৎসাহ প্রদান জরুরি। তরুণ প্রজন্ম যদি গঠনমূলক ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে, তবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও সহনশীলে পরিণত হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও উচিত কর্মীদের মধ্যে শালীন ভাষা, সহনশীলতা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের মূল্যবোধ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়, যদিও তা আইনসিদ্ধ সীমাবদ্ধতার অধীন। এই সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে ব্যক্তি তার মতামতের জন্য অপবাদ বা অযাচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের শিকার হবেন না।
রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ট্যাগিং সংস্কৃতি সেই লক্ষ্যকে দুর্বল করে, কারণ এটি নীতিগত বিতর্ককে ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপান্তরিত করে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন যুক্তির রাজনীতি, তথ্যের রাজনীতি এবং সহনশীলতার রাজনীতি—ট্যাগিংয়ের রাজনীতি নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ ভয়হীনভাবে কথা বলতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে এবং যুক্তির মাধ্যমে একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক, কিন্তু ট্যাগিং নয়; মতের পার্থক্য থাকুক, কিন্তু বিদ্বেষ নয়; সমালোচনা থাকুক, কিন্তু অপবাদ নয়। এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটি পরিণত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
লেখকঃ কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
সম্পাদক- শঙ্খতীর।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; চন্দনাইশ সিভিল সোসাইটি।