এসব দিন-রাতে ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুমিম মুসলিম তাঁর জীবন আমলে সমৃদ্ধি করতে পারেন। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি ইসলামি শরিয়ত সুন্নাত,মুস্তাহাব ও নফল ইবাদতকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
শাওয়ালের ছয় রোযা রাখা অত্যন্ত বরকতময় আমল ও সুন্নাতে রাসূলের অনুসরণ। পবিত্র মাহে রমজানের দীর্ঘ এক মাস বরকতময় সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিনগণ যে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছে তা ধরে রাখা মুমিন নর-নারীর একান্ত ঈমানী দায়িত্ব।
তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা এবং দীর্ঘ একমাস রমযান শরীফে তাকওয়া, বরকত, পরহেযগারী ও ইবাদতের প্রতি মনোযোগ ও আকর্ষণকে ধরে রাখতে রমযানের পরে মাহে শাওয়ালের ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত ইবাদতের সাথে সাথে কিছু নফল ইবাদত ও নফল রোযা রাখার প্রতি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতদেরকে উৎসাহ প্রদান করেছেন।
অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও ফজিলতপূর্ণ।
তন্মধ্যে শাওয়াল মাসের ছয় রোযা (নফল) অন্যতম ফজিলতমণ্ডিত ইবাদত, তদুপরি রমযান শরীফের ফরয রোযার যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে থাকে শাওয়ালের ছয়টি নফল রোযার মাধ্যমে তা আল্লাহর রহমতে মাফ হয়ে যায়।
পবিত্র মাহে শাওয়ালের ছয়টি নফল রোযা পালনের গুরুত্ব, ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হুযুর পূরনুর রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-জলীলুল কদর সাহাবী এবং প্রিয়নবীর অন্যতম খাদেম হযরত সাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল’। (মুসলিম: ১১৬৪; আবু দাউদ: ২৪৩৩)
মাগফিরাত ও নাজাতের ফজিলত সমৃদ্ধ মাহে রমজানের বিদায়লগ্নে শাওয়াল মাসের শুরুতেই পাপাচারের আশঙ্কা থাকে প্রবল। এ মাসে নিজের নফসকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা কঠিন।
এছাড়া সহীহ মুসলিম শরীফে উল্লেখ রয়েছে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত, রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখে অতঃপর (রমযানের রোযার) অনুসরণে শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোযা রাখে, তার জন্য সর্বদা রোযা রাখার সাওয়াব হবে।
[সহীহ মুসলিম শরীফ: ১ম খন্ড, পৃ-৩৩৯, ও মিশকাত শরীফ]
সাহাবীয়ে রাসূল হজরত উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন—তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে, কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের ৬ রোজা রাখো, তাহলেই তুমি সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে। (তিরমিজি: ১/১৫৩৪)
নফল ইবাদতের সীমাহীন গুরুত্ব বর্ণনায় পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- যখন তুমি (ফরজ) দায়িত্ব সম্পন্ন করবে তখন উঠে দাঁড়াবে এবং তুমি (নফলের মাধ্যমে) তোমার রবের প্রতি অনুরাগী হবে’। (সূরা: ইনশিরাহ, আয়াত: ৭-৮)
বর্ণিত রয়েছে- যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পর (শাওয়াল মাসে) ছয়টি (নফল) রোযা পালন করে, তার জন্য সারা বছরের রোযা পালন হয়ে যাবে। কারণ যে একটি ইবাদত করে তার জন্য দশগুণ সাওয়াব রয়েছে। [ইবনে মাযাহ-১ম খন্ড, পৃ-১২৪]
বস্তুত হাদিস শরিফ সমূহে পবিত্র কোরআন শরিফের একটি আয়াতের সঙ্গে মিলে যায়। আয়াতটি হলো আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- কেউ কোনো নেক আমল করলে, তাকে তার ১০ গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। (সূরা: আনআম, আয়াত: ১৬০)
রমজানের ১ মাসের দশগুণ হলো ১০ মাস আর শাওয়াল মাসের ৬ দিনের দশগুণ হলো ৬০ দিন অর্থাৎ ২ মাস। সুতরাং ৩৬টি রোজায় সারা বছর বা ৩৬০টি রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়।
রমদ্বানের কাযা নাকি ৬রোযা আগে?
ফরজ কাযাকে আগে গুরুত্ব দেয়া উচিত। কাযা রেখে যে রোযাগুলো রাখা হয় সেগুলো কাযা আদায়ের হকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা যার ওপর কাজা রয়ে গেছে সে রোজা পুর্ণ করেছে বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ ঐ রোজাগুলোর কাজা আদায় না করে’। (আল মুগনি: ৪৪০)
তবে এই বিষয়ে ফকীহ ওলামায়ে কেরামের মতামত হল- কাজা রোজার সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে আগে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখা উত্তম। কেননা শাওয়াল শেষ হয়ে গেলে অন্য মাসে এই ৬ রোজার ফজিলত নেই। কিন্তু কাজা রোজা বছরের যেকোনো সময় রাখলেই আদায় হয়ে যায়।
তবে উচিত হলো রমজানে কাযা হওয়া ফরজ রোজাগুলো অবশ্যই যথাসময়ে গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করা। কেউ যেন রমজানের কাযা রোজা আদায়ে গড়িমসি না করে, বিলম্ব না করে এই বিষয়ে হুশিয়ার থাকবে।
তাই শাওয়ালের ছয় রোযা পালনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্-রসূলের রেযামন্দি ও সফলতা অর্জিত হবে সহজে। মাহে রমযানের একমাস ফরয রোযা পালনের পর শাওয়ালের নফল রোযা রাখলে সারা বছর রোযা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। অধিকাংশ ইমাম এ ছয় রোযার প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।
লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক-
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদরাসা, ষোলশহর,চট্টগ্রাম।
খতিব-
মসজিদে রহমানিয়া গাউসিয়া, বায়েজিদ বোস্তামী, চট্টগ্রাম।