
দেশে জাতীয় সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে, সঙ্গে বেড়েছে প্রতিনিধিদের সংখ্যাও। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেক জায়গায় এই প্রতিনিধিদের একটি অংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল বা অনৈতিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ শোনা যায়। প্রশ্ন হলো, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?
প্রথমত, অধিকাংশ প্রতিনিধি যে সম্মানী বা ভাতা পান, তা খুবই সামান্য। অনেকেরই সেই টাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কেউ কেউ অবৈধ পথে বাড়তি আয়ের প্রলোভনে পড়ে যান।
দ্বিতীয়ত, অনেক প্রতিনিধির সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কোনো পেশাগত দক্ষতা বা আয়ের উৎস নেই। ফলে তারা পুরোপুরি এই পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
তৃতীয়ত, জাতীয় সংবাদপত্রগুলোর অনেকেই মাঠপর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়মিত নজরদারি করে না। সাধারণত কোনো অভিযোগ, মামলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তখনই বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
চতুর্থত, অনেক ক্ষেত্রে কিছু অসাধু প্রতিনিধি একজোট হয়ে কাজ করেন। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস পায় না। কিন্তু এর ফলে স্থানীয় সাংবাদিকতা পেশার প্রতি মানুষের মনে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়।
পঞ্চমত, মিডিয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়ার ফলে অনেক ভুঁইফোড় সাংবাদিকও তৈরি হয়েছে। এদের অনেকেই জানেন না সংবাদ কীভাবে সংগ্রহ করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় বা কীভাবে একটি প্রতিবেদন লিখতে হয়। সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার বিষয়টিও অনেক সময় তাদের অজানা থেকে যায়।
ষষ্ঠত, অনেক সাংবাদিককে আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। যখন একজন সাংবাদিক নিজেই কোনো দলের নেতা বা পদধারী হন, তখন তার কাছ থেকে নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকলে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা স্বাভাবিকভাবেই জটিল হয়ে যায়।
সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে শফিক রেহমান বলেছিলেন—লেখালেখির পাশাপাশি অন্য ক্ষেত্রেও দক্ষতা অর্জন করা উচিত, যেন প্রয়োজনে অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা যায়। কারণ বাস্তবতা হলো, কেবল সাংবাদিকতার আয়ে অনেক সময় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, তিনি নিজেও পেশায় একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
অবশ্যই সব সাংবাদিককে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে। দেশে অনেক সৎ, নিষ্ঠাবান ও সাহসী সাংবাদিক আছেন, যারা নীতির সঙ্গে আপস করেন না। তবে এটাও সত্য যে কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। আবার এমন কিছু মানুষও আছেন, যাদের চরিত্রগত দুর্বলতার কারণেই তারা সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করেন। এ ধরনের ব্যক্তিদের অবশ্যই সাংবাদিকতা থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংবাদদাতা নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পেশাগত মানদণ্ডের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সম্ভব হলে শিক্ষক, গবেষক বা অন্যান্য পেশাজীবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় সংবাদপত্রগুলোর উচিত মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিদের কাজের ওপর নিয়মিত তদারকি রাখা।
প্রতিনিধিদের জন্য সম্মানজনক বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও জরুরি। পাশাপাশি প্রতিটি সংবাদপত্রের হেড অফিসে একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগ নম্বর থাকা উচিত, যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই অভিযোগ জানাতে পারবেন।
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। সমাজের চোখ ও বিবেক হিসেবে এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক এবং সমাজ—সবারই সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন।
Leave a Reply