কর্ণফুলী নদীর তীরে বাকলিয়া বলিরহাট স্লুইসগেট-এর পাশে মুজিযা পাঠাগারের উদ্বোধনী আয়োজন বেশ জমজমাটভাবেই চলছিলো। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা খ্যাতনামা সাহিত্যিক, কবি ও মার্শাল আর্টের সম্মানিত ও গুণী ব্যক্তিগণ তখন উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তাদের অনেকেই জানতেন না যে কবিতার পাশাপাশি লেখালেখির ঘরণায় বেড়ে ওঠা এই মেয়েটি মার্শাল আর্টে ঠিক কতটা পটু। শিক্ষিকা বিবি শাহীজান অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে আর পুরো অনুষ্ঠানের দিকনির্দেশনা দিতে ব্যস্ত ছিলেন। ডক্টর নীলিমা তাপসী একপাশে দাঁড়িয়ে নতুন আসা বইয়ের তাকগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলেন। আর সাংবাদিক জুলিয়া মুন তার ক্যামেরা হাতে আয়োজনের দারুণ সব ফ্রেম বন্দি করছিলেন।
এরই মাঝে এক কোণায় শাদা টেবিলের পাশে বসে আয়েশ করে রং চা খাচ্ছিলেন অভিলাষ। চারপাশের মানুষের ভিড় আর নদীর বাতাসের মাঝেও তাঁর নিজস্ব একটা জগৎ ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটলো। কোত্থেকে কয়েকজন স্থানীয় বখাটে ছেলে এসে মুজিযাকে ঘিরে ধরলো। অযথাই উঁচু গলায় তর্ক জুড়ে দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করলো তারা। ওদের আচরণে মনে হচ্ছিলো যেন কোনো সুরক্ষিত সিস্টেমে হঠাৎ ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়লো।
মুজিযা একটুও ঘাবড়ালো না। বাবার কাছে উশু আর তাই চির তালিম নেওয়া মেয়ে সে। উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিরা এমন আকস্মিক ঘটনায় কিছুটা অবাক হয়ে গেলেও মুজিযার আত্মবিশ্বাস দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
লিডার গোছের ছেলেটা তাচ্ছিল্য করে এক পা সামনে বাড়ালো। কিন্তু মুজিযা পিছপা হলো না। ছেলেটা হাত তোলার আগেই মুজিযার ডান হাতটা শূন্যে সাঁই করে ঘুরে গেলো। যেন কোনো এনক্রিপ্টেড ডেটা ট্রান্সফার হচ্ছিলো একেবারে নিঃশব্দে। চোখের পলকে মুজিযার হাতের শক্ত তালু ছেলেটার কাঁধের নার্ভে গিয়ে পড়লো।
তবে মুজিযার আসল আঘাতটা শারীরিক ছিলো না। বাবার কাছ থেকে রপ্ত করা হিপনোটিজমের কৌশলটা সে দারুণভাবে কাজে লাগালো। মুজিযা স্থির চোখে লিডার ছেলেটার চোখের দিকে তাকালো। উশু আর তাই চির সাথে হিপনোটিজমের অদ্ভুত এক মিশ্রণ ছিলো সেই শান্ত দৃষ্টিতে। মনে হলো যেন ছেলেটার ব্রেইনের প্রসেসরে শর্টসার্কিট ঘটে গেলো। ভড়কে গিয়ে সে নিজের দলবলের দিকেই বোকার মতো তাকিয়ে অসংলগ্ন আচরণ শুরু করলো।
আমন্ত্রিত মার্শাল আর্ট গুরু ও সাহিত্যিকরা চোখের পলকে মুজিযার এই নিখুঁত কৌশল দেখে রীতিমতো বিস্মিত হলেন—কেউই ঘুণাক্ষরে টের পাননি যে কবি অভিলাষ তাঁর মেয়েকে এমন এক কঠিন আত্মরক্ষার পাঠে গড়ে তুলেছেন।
বাকিরা অবস্থা বেগতিক দেখে কোনো কথা না বাড়িয়ে নিমেষেই ভিড়ের মাঝে সটকে পড়লো। পুরো ঘটনাটা ঘটলো এত দ্রুত আর নিঃশব্দে। জুলিয়া মুনের ক্যামেরার শাটার ততক্ষণে এই নিখুঁত অ্যাকশনের ছবিটা তুলে নিলো। নীলিমা তাপসী দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে মুজিযার সাইকোলজিক্যাল আর ফিজিক্যাল স্কিলের প্রশংসা করলেন। আর শাহীজান মেয়ের সাহসিকতা আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দক্ষতা দেখে গর্বিত ভঙ্গিতে হাসলেন।
অভিলাষ সন্তুষ্ট চিত্তে হাসলেন। তারপর হাতের কাপটা তুলে নিলেন। শাদা টেবিলের ওপর রাখা রং চা তখনো বেশ গরম।