
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম রিয়াদ
স্টাফ রিপোর্টার
নাচ গান তবলা গিটারসহ সব সাংস্কৃতিক বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত
চট্টগ্রামের স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুরপঞ্চম সংগীত নিকেতনের বার্ষিক পরীক্ষা আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্যতিক্রমী এই আয়োজনটি সম্পন্ন হয় নগরীর দক্ষিণ কাট্টলি এলাকার বাসন্তী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে। সকালে শুরু হওয়া এই পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় চার শতাধিক শিক্ষার্থী।শিশু কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ তরুণী সবাই অত্যন্ত উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে অংশগ্রহণ করে।পুরো পরীক্ষাকেন্দ্রজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। শিক্ষার্থী অভিভাবক ও অতিথিদের উপস্থিতিতে দিনটি যেন রূপ নেয় এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
সুরপঞ্চম সংগীত নিকেতন দীর্ঘদিন ধরে সংগীত নৃত্য আবৃত্তি চিত্রাঙ্কন ও বাদ্যযন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রেখে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরীক্ষা তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি শিক্ষার্থীদের সারা বছরের অনুশীলনের মূল্যায়ন এবং আত্মপ্রকাশের এক অনন্য সুযোগ।এদিন বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় যার মধ্যে ছিল নাচ গান তবলা চিত্রাঙ্কন আবৃত্তি গিটার ঢোলসহ সংস্কৃতির নানা শাখা।প্রতিটি বিষয়েই শিক্ষার্থীরা তাদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান উপস্থাপন করে। কোথাও ছিল তাল লয় ও স্বরলিপি বিষয়ক প্রশ্ন আবার কোথাও ছিল সুরের ইতিহাস ও প্রয়োগভিত্তিক মূল্যায়ন।
পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক উত্তেজনা কাজ করছে।কেউ শেষ মুহূর্তে নোট দেখছে কেউ আবার চুপচাপ চোখ বুজে সুর মনে করার চেষ্টা করছে। অভিভাবকেরাও উদ্বিগ্ন কিন্তু সন্তানের সাফল্যের আশায় আশাবাদী। পরীক্ষার শৃঙ্খলা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রশাসনিক সদস্যদের কঠোর তদারকি। ফলে গোটা পরীক্ষা প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
এদিন পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন সুরপঞ্চম সংগীত নিকেতনের অধ্যক্ষ শিমুল দাশ এবং সহকারী অধ্যক্ষ রিয়া দাশ। তারা পুরো পরীক্ষা কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন।এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তবলার শিক্ষক পলাশ অভিজিৎ ধর রুবেল চৌধুরী সিনিয়র শিক্ষিকা মুন্নী বড়ুয়া মিতা দাশ বিপুল দাশ দীপা মজুমদার পরী ধরসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ।উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক বাচ্চু বড়ুয়া সহ বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দও।সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে সুরপঞ্চম সংগীত নিকেতন শুধু শিক্ষা দিচ্ছে না বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংস্কৃতি চর্চার প্রতি অনুপ্রাণিত করছে।
অধ্যক্ষ শিমুল দাশ পরীক্ষার সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।তিনি বলেন সারা বছর ধরে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অনুশীলন করে।এ ধরনের বার্ষিক পরীক্ষা তাদের শেখার ধারাকে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। তিনি আরও জানান প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু ভালো শিল্পী তৈরি নয় বরং ভালো মানুষ তৈরিতে সহায়ক হওয়া। কারণ সংস্কৃতিচর্চা মানুষের মননকে পরিশীলিত করে সহনশীলতা ও মানবিকতা শেখায়।
সহকারী অধ্যক্ষ রিয়া দাশ জানান এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই করতে পারে। শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা নয় বাস্তব জীবনে উপস্থাপনার সক্ষমতাও এই প্রশিক্ষণের অংশ। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এই শিশুরাই ভবিষ্যতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে অবদান রাখবে।
অভিভাবকদের অনেকেই মনে করেন আজকের এই আয়োজন তাদের সন্তানদের জন্য অনন্য অনুপ্রেরণা।একদিকে তারা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষার অভিজ্ঞতা পাচ্ছে অন্যদিকে সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করতে পারছে। ফলে পড়ালেখার পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতিতেও তারা তৈরি হচ্ছে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী জানায় সে গান বিষয়ক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।সারা বছর ধরে নিয়মিত অনুশীলন করায় পরীক্ষাটি তাকে খুব কঠিন মনে হয়নি। আরেকজন শিক্ষার্থী জানায় তবলা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে সে বারবার বাড়িতে অনুশীলন করেছে যাতে তাল লয়ে কোনো ভুল না হয়। শিশুদের এই আন্তরিকতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার মন ছুঁয়ে যায়।
সার্বিকভাবে দেখা গেছে পরীক্ষাটি শুধু একটি শিক্ষামূলক আয়োজন নয় বরং এটি ছিল আনন্দ উৎসব ও সৃজনশীলতার এক বিরল সম্মিলন।শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমন্বিত অংশগ্রহণে দিনটি পরিণত হয় এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতায়।অনেকেই মনে করেন এ ধরনের ইতিবাচক সাংস্কৃতিক উদ্যোগ সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ সংস্কৃতি মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করে সামাজিক সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং সহনশীল সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
জানা গেছে পরীক্ষার ফলাফল আগামী মাসে প্রকাশ করা হবে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ফলাফল বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানানো হবে যাতে সবাই সহজেই তা জানতে পারে। শিক্ষার্থীরাও সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছে।সারা বছরের পরিশ্রমের ফলাফল হাতে পাওয়ার আগ্রহ তাদের চোখে মুখে স্পষ্ট।
চট্টগ্রামে আজ যে আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হলো তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে এখনো এই শহরে সাংস্কৃতিক চর্চা বেঁচে আছে এবং মানুষ এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সুরপঞ্চম সংগীত নিকেতনের এই বার্ষিক পরীক্ষা তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কার্যক্রম নয় বরং এটি একটি ইতিবাচক সামাজিক বার্তা।তা হলো শিশুদের হাতে বইয়ের পাশাপাশি তুলে দিতে হবে সুর তাল রং ও শিল্পচর্চার অবারিত দিগন্ত।
Leave a Reply