মোঃ শহীদুল ইসলাম
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
ভালোবাসার বন্ধনে গড়া পাঁচ বছরের সংসার। দুই সন্তানের হাসিতে ভরপুর ছোট্ট একটি পরিবার। কিন্তু সেই সংসারই এক ভয়াবহ পরিণতিতে শেষ হয়—স্বামীর হাতেই প্রাণ হারান তরুণী গৃহবধূ ফারজানা আক্তার লিমা (২২)। কুমিল্লার বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি স্বামী মো. শিপন মিয়াকে অবশেষে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৭।
র্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২ এপ্রিল ভোররাতে বাকলিয়া থানাধীন এক্সেস রোড এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা শিপন মিয়ার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযানিক দল তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এতে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিহত ফারজানা আক্তার লিমা কুমিল্লা হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা। প্রায় পাঁচ বছর আগে ভালোবেসে শিপন মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। জীবিকার তাগিদে শিপন মৌসুমি ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন—গরমকালে ডাব ও শীতকালে পিঠা বিক্রি করতেন। সেই সংগ্রামী জীবনে স্বামীর পাশে থেকে সহযোগিতা করতেন লিমা। তবে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও পারিবারিক কলহ তাদের দাম্পত্যে অশান্তির জন্ম দেয়।
ঘটনার দিন ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পারিবারিক বিরোধ নতুন করে চরমে ওঠে। শাশুড়ি ও ননদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পরে স্বামী শিপন মিয়া পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় ফারজানা আক্তার লিমাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। ঘটনার পরপরই আসামিরা পালিয়ে যায়।
নিহতের বড় ভাই মো. রায়হান খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে বোনের মরদেহ দেখতে পান এবং শরীর ও গলায় আঘাতের চিহ্ন লক্ষ্য করেন। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালী মডেল থানায় চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৮৪, তারিখ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬; ধারা: ৩০২/৩৪ পেনাল কোড)।
মামলার পর থেকেই প্রধান আসামি শিপন মিয়া পলাতক ছিলেন। গ্রেফতার এড়াতে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব-৭ জানায়, গ্রেফতারের পর আসামিকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বাকলিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, গুরুতর অপরাধ করে কেউ আইনের বাইরে থাকতে পারবে না—দেশের যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে।
এই হত্যাকাণ্ড আবারও সামনে এনেছে পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক সহিংসতার ভয়াবহ বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পারিবারিক বিরোধের সমাধান না হলে তা অনেক সময় চরম সহিংসতায় রূপ নেয়। একটি স্বপ্নময় সংসারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি সমাজের জন্য গভীর সতর্কবার্তা হয়ে রইল।