আশি ও নব্বইয়ের দশকের এক রঙিন রূপকথা। ধোঁয়া, গর্জন আর চাকার ঘূর্ণিতে সে যুগে পিচঢালা রাজপথ ধেপে বেড়াত এই তিন চাকার বাহনটি। হৃদয়ে দোলা দেওয়ার মতো সেই নস্টালজিক স্মৃতিগুলো রোমন্থন করছি। টু-স্ট্রোক ইঞ্জিনের সেই চিরপরিচিত "ফটফট" কিংবা "ভটভট" গর্জন দূর থেকেই জানান দিত বেবীট্যাক্সির আগমনী বার্তা। পেছনে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে যখন এটি দ্রুতবেগে ছুটে চলত, পথচারীদের চোখ আপনাতেই আটকে যেত।
কলেজ জীবনে বাদুরতলা আরকান হাউজিং সোসাইটির বি ব্লকে মনির ভিলায় (আমার পিতার নামে) বসবাসকালীন বাদুরতলার বেবীট্যাক্সি ড্রাইভার আবদুল্লাহ ভাই ছিল আমার পারমানেন্ট। লোকটি ছিল হাসিমাখা মুখের বেশ নাদুসনুদুস বন্ধুত্বসুলভ।
খুব বেশি না শহরের ভেতরে ২০ থেকে ২৫ টাকায় যাতায়ত। শহরের বাইরেও তিনি সবসময় আমার যাত্রা পথের সঙ্গী হয়ে থাকতেন। সেসময়ের সোসাইটির কিছু সঙ্গীর কথা না বললে নয়, রাজুু, নাজিম, ফাহিম, সাইফুল প্রতিদিন বিকেলে আড্ডা দেওয়া। সাইফুল ছিলো ছোট মামা ডাকতো, অনেক সম্মান করতো। আমার কবিতার ভক্ত ছিলো। ভাতিজি শারমিন ও মুন্নি ছিলো খুবই মিশুক। বশর ভাই ও ভাবী আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। রেনেসাঁ কিন্ডার গার্টেন স্কুলের গোড়াপত্তন আরকান হাউজিং সোসাইটিতে। বড় পুকুরে গোসল করা। দিদারের মা নানী, কতশত স্মৃতি ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে কে কোথায় কিছুই জানিনা। যাওয়াও হয়নি আর কখনো। একাউন্টটিং এর মোজাহিদ স্যার থাকতেন এ ব্লকে আমি ওনার নিয়মিত ছাত্র কলেজের ১ম বর্ষ হতে। তিনি আমার খুব প্রিয় স্যার। উষার মা ভাবি, উষার আব্বা, রিটু ভাই (পরবর্তীতে আত্মীয়) অনেক অনেক হাসি মজার সময় কেটেছে।
বেবীট্যাক্সি যেন ছিল ক্যানভাসে আঁকা এক টুকরো রিকশা-আর্ট। গায়ে ছিটানো ফুল, ময়ূর, তারার সোনালি দ্যুতি আর চালকের ভালোবাসায় সাজানো কৃত্রিম গোলাপ, রঙিন ঝুল আর আয়নার ঝিলিক—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক দৃষ্টিনন্দন সচল শিল্পকর্ম। ঈদের আনন্দ সফর, কোনো আত্মীয়ের বিয়ের ধুম কিংবা দূরযাত্রার পথশেষে ট্রেন স্টেশন থেকে বাক্স-পেটরা নিয়ে বাড়ি ফেরা—বেবীট্যাক্সি না হলে যেন জমতই না। সেই সংকীর্ণ পেছনের সিটে গাদাগাদি করে বসা পরিবারটির মুখে তখন ফুটে উঠত এক চিলতে বাঁধভাঙা তৃপ্তি। সিটের পাশে থাকা শক্ত লিভারে ড্রাইভারের সেই মোচড় দিয়ে এক টানে চালনা করার কৌশলটি ছিল দেখার মতো। কোনো দরজা-জানালাহীন খোলা খোপে বসে হু হু বাতাসের মুখোমুখি হওয়া, মাঝেমধ্যে ঝাঁকুনির দোলায় দুলে ওঠা—এসবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সেই সময়ের শহুরে রোমাঞ্চ।
এই ধরুন আজকাল ২০/২৫ টাকায় রিকশাও পাওয়া যাবেনা। অথচ আমরা সিকি পয়সায় বাসে ছড়েছি। জামালখান আইডিয়াল স্কুলে পড়ত ভাতীজা মানিক।বাদুরতলা থেকে জামাল খান ভাড়া ছিলো মাত্র ৮/১০ টাকা রিকশায়। সেসময়ে নিউমার্কেট যেতে ২০/২৫ টাকায় বেবিট্যাক্সি পাওয়া যেতো। সবকিছু আজ ছবির মতো ফ্রেমে বন্দী। আরকান হাউজিং সোসাইটির পরিবর্তন হয়েছে। বদলে গেছে স্থান কাল পাত্র। বদলায়নি শুধু ফেলে আসা দিনগুলো।
পরিবেশবান্ধব সবুজ সিএনজির ভিড়ে এই রূপালী আর হলুদ-কালো রঙের ঐতিহ্য আজ হয়তো রাজপথ থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু আমাদের স্মৃতিমধুর শৈশব ও কৈশোরের সোনালি দিনগুলোতে এই বেবীট্যাক্সি অমলিন রাজত্ব চালিয়েছে।
লেখকঃ সম্পাদক