মুহাম্মদ জুয়েল, বোয়ালখালী :
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা সদর-দিনের শুরুতেই এখানে ভিড় জমে। কেউ আসে চিকিৎসার জন্য, কেউ পড়াশোনার প্রয়োজনে, কেউবা বাজারে। সব মিলিয়ে ব্যস্ত, জীবন্ত এক জনপদ। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর নীরবতা-প্রয়োজনের সময় নেই কোনো পাবলিক টয়লেট।
প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষের আনাগোনা এই এলাকায়। সকালে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, দুপুরে রোগী আর স্বজন, বিকেলে বাজারে আসা ক্রেতা-সবাই মিলে জমজমাট পরিবেশ। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে সবারই পড়তে হয় একই সমস্যায়-কোথাও নেই ব্যবহারযোগ্য কোনো পাবলিক টয়লেট।
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে এই সংকট যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সদরের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের অপেক্ষা করতে হয় টানা তিন ঘণ্টা। কিন্তু এই অপেক্ষাই হয়ে ওঠে দুঃসহ, যখন জরুরি প্রয়োজনে আশপাশে খুঁজেও পাওয়া যায় না কোনো টয়লেট।
পশ্চিম কধুরখীল থেকে আসা তাসলিমা বারবার চারপাশে তাকাচ্ছিলেন। অস্বস্তি লুকাতে পারছিলেন না। একটু থেমে বললেন, মহিলাদের জন্য এটা খুব কঠিন। কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা নেই। এমন একটা জায়গায় এই সমস্যা থাকাটা কষ্টদায়ক।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. রফিক। নাতির পরীক্ষার সময়টুকু পার করছেন রাস্তার পাশে বসে। বয়স হয়েছে, বারবার টয়লেট লাগে। কিন্তু কোথায় যাব? কথাগুলো বলতে বলতেই যেন অসহায় হয়ে পড়েন তিনি।
এই চিত্র শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেও শুনা যায় একই কথা । রোগী আর স্বজনদের ভিড়, আর তাদের মাঝেই লুকিয়ে থাকা অস্বস্তি। শ্রীপুর-খরণদ্বীপের কুনছুমা বেগম বলেন, চিকিৎসা নিতে এসে এমন সমস্যায় পড়তে হবে ভাবিনি।
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় এখানে একটি পাবলিক টয়লেট ছিল। কিন্তু উন্নয়নের কাজে সেটি হারিয়ে গেছে, ফিরে আসেনি আর। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ পড়ছেন বিড়ম্বনায়।
পরীক্ষার সময় কিংবা সাধারণ দিন-একই অভিযোগ, একই কষ্ট। কিন্তু বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে শিক্ষক প্রলয় চৌধুরী মুক্তি বলেন, আমাদের পক্ষে আলাদা করে কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।
এদিকে মার্কেট এলাকার কর্মচারী রহিমের অভিজ্ঞতা যেন আরও বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেন, মসজিদের টয়লেট নামাজের সময় খোলা থাকে, কিন্তু পরে বন্ধ হয়ে যায়। তখন প্রয়োজন হলে কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না-খুব সমস্যায় পড়তে হয়।
চরণদ্বীপ থেকে আসা মো. নাছেরের কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, এখানে সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবে না। এত জনপ্রতিনিধি আসেন-যান, কিন্তু এই মৌলিক সমস্যার সমাধান হয় না।
তবে এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন মেহেদী হাসান ফারুক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পাবলিক টয়লেট নির্মাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চান সাধারণ মানুষ। তাদের প্রত্যাশা-পরিকল্পিত উদ্যোগে দ্রুত পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হোক, যাতে বোয়ালখালীর এই প্রাণকেন্দ্রটি সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠতে পারে।