কোনো জাতির সভ্যতার মান বিচার করতে চাইলে শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিকে তাকালেই হয় না; তাকাতে হয় সে তার নদী, বন, মাটি এবং খাদ্যের উৎসগুলোর সঙ্গে কেমন আচরণ করে। কারণ একটি জাতি তার জীবনদায়ী সম্পদের সঙ্গে যেমন আচরণ করে, ভবিষ্যৎও একদিন তার সঙ্গে তেমন আচরণ করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে হালদা নদী আজ শুধু একটি পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং উন্নয়ন-দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।
চট্টগ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া হালদা বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটাপ্রভাবিত প্রাকৃতিক কার্প মাছের প্রজননক্ষেত্র। রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রাকৃতিক ডিম সংগ্রহের জন্য হালদার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। দেশের অসংখ্য হ্যাচারি, পোনা উৎপাদন কেন্দ্র এবং মৎস্য খামারের ভিত্তি গড়ে উঠেছে এই নদীর ওপর নির্ভর করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশের মানুষের খাবারের থালায় যে মাছ পৌঁছে, তার গল্প বাজারে শুরু হয় না; শুরু হয় হালদার বুকে।
আমি প্রায়ই তরুণদের বলি, হালদাকে শুধু একটি নদী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের একটি “অদৃশ্য কৃষিজমি”। কৃষিজমিতে যেমন ধান জন্মায়, তেমনি হালদা জন্ম দেয় মাছের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। যে জমি ধান উৎপাদন করে, তাকে আমরা রক্ষা করতে চাই। কিন্তু যে নদী মাছ উৎপাদন করে, তাকে দূষণের হাতে ছেড়ে দিতে আমাদের দ্বিধা হয় না। এখানেই আমাদের চিন্তার বড় ঘাটতি।
বিভিন্ন গবেষণায় হালদা নদীর দূষণ নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিক এবং বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিভিন্ন সময়ে মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, জরিমানা করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—সমস্যা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
তবে আমি মনে করি, হালদার সংকট মূলত প্রযুক্তিগত সংকট নয়; এটি একটি নৈতিক সংকট।
কারণ নদীতে বর্জ্য পড়ার আগে মানুষের মনে একটি চিন্তা জন্ম নেয়—“এতে কিছু হবে না”, “একটা প্লাস্টিক ফেললে ক্ষতি কী?”, “নদী তো সব বয়ে নিয়ে যাবে।” দূষণের শুরু আসলে সেখানেই। অর্থাৎ হালদার দূষণ কারখানার পাইপে শুরু হয় না; শুরু হয় মানুষের চিন্তায়।
আমরা নিজের ঘর পরিষ্কার রাখি। নিজের সন্তানকে বিশুদ্ধ খাবার খাওয়াতে চাই। নিজের রান্নাঘরে আবর্জনা ফেলি না। কিন্তু যে নদী আমাদের খাদ্যের উৎস, সেই নদীতে বর্জ্য ফেলতে দ্বিধা করি না। এটি শুধু আচরণগত সমস্যা নয়; এটি আমাদের নৈতিক বৈপরীত্য।
প্রাচীন সভ্যতাগুলো নদীকে শ্রদ্ধা করত, কারণ তারা জানত নদী মানে জীবন। আজ আমরা সেই উপলব্ধি হারিয়ে ফেলেছি। আমরা খাদ্যের জন্মস্থানকে পবিত্র ভাবতে ভুলে গেছি। নদীকে আমরা জীবনদায়ী সত্তা হিসেবে নয়, ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখেছি।
আমার কাছে হালদা শুধু একটি নদী নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের প্রতীক। কারণ নদীতে ফেলা বর্জ্য নদীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা মাছের শরীরে যায়, খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে, শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই ফিরে আসে। তাই হালদা দূষণ কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবেশগত ঘটনা নয়; এটি খাদ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে অপরাধ।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত দেশের নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—নদী কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু নয়। তারও অস্তিত্ব আছে, মর্যাদা আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
এখন আমি পাঠকদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই।
একবার কল্পনা করুন, হালদা যদি একজন সুন্দরী নারী হতো? আমরা কি তার মুখে পলিথিন ছুড়ে মারতাম? আমরা কি তার শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিক ঢালতাম? আমরা কি তাকে নর্দমার পানি দিয়ে ভাসিয়ে দিতাম?
আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবুন।
হালদা যদি আমার বা আপনার মা হতেন? যদি তিনি আমাদের বোন হতেন? যদি তিনি আমাদের স্ত্রী হতেন? যদি তিনি আমাদের কন্যা হতেন?
তাহলে কি আমরা তাঁর গায়ে আবর্জনা নিক্ষেপ করতাম?
নাকি তাঁকে আগলে রাখতাম?
নিশ্চয়ই আমরা তাঁকে রক্ষা করতাম। তাঁর সম্মান, নিরাপত্তা ও সুস্থতার জন্য উদ্বিগ্ন হতাম। কারণ মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি আছে, ভালোবাসা আছে, দায়িত্ববোধ আছে।
কিন্তু হালদার ক্ষেত্রে আমরা কেন সেই একই অনুভূতি দেখাতে পারি না?
কারণ আমরা এখনো নদীকে অনুভব করতে শিখিনি। আমরা তার অর্থনৈতিক মূল্য বুঝি, কিন্তু নৈতিক মূল্য বুঝি না। আমরা তার উপকার ভোগ করি, কিন্তু তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব স্বীকার করতে চাই না।
আজ হালদা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্নটি শুধু পরিবেশের নয়, শুধু উন্নয়নের নয়, শুধু খাদ্যনিরাপত্তারও নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই?
একটি কৃতজ্ঞ সমাজ, নাকি একটি অকৃতজ্ঞ সমাজ?
একটি দায়িত্বশীল সমাজ, নাকি একটি উদাসীন সমাজ?
হালদা আজ বাংলাদেশের নৈতিক আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।
তাই হালদায় একটি প্লাস্টিক, একটি বোতল, একটি প্যাকেট বা এক ফোঁটা বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার আগে একবার থামুন। একবার ভাবুন—
হালদা যদি একজন সুন্দরী নারী হতেন, যদি তিনি আমার বা আপনার মা, বোন, স্ত্রী কিংবা কন্যা হতেন—তবে কি আমরা তাঁর মুখে আবর্জনা ছুড়ে মারতাম, নাকি তাঁকে সযত্নে আগলে রাখতাম?
যদি উত্তর হয় “আগলে রাখতাম”, তাহলে হালদাকেও আগলে রাখুন।
কারণ যে নদী আমাদের খাওয়ায়, তাকে রক্ষা করা কোনো দয়া নয়; এটি আমাদের নৈতিক, সামাজিক এবং জাতীয় দায়িত্ব।
লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জালালাবাদ সিভিল সোসাইটি