শুরু করছি মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার পবিত্র নামে, যাঁর মহিমা অসীম এবং যাঁর সমতুল্য আর কেউ নেই। পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় দরুদ ও সালামের অফুরন্ত নাজরানা পেশ করছি রাহমাতুল্লিল আলামিন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি।
কালচক্রের চাকা ঘুরতে ঘুরতে আমাদের নিকট আবার উপস্থিত হতে চলেছে পবিত্র মাহে মহররম, যার মাধ্যমে সূচনা হবে নতুন হিজরি সন। একজন মুসলমান হিসেবে এটি আমাদের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই হিজরি নববর্ষ কখন আসে এবং কখন যায় সে সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশই বেখেয়াল। অথচ থার্টি ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষের ক্ষেত্রে তা কখন আসবে, সেই উপলক্ষে কী কী করা যায়—সে সম্পর্কে সকলের মধ্যে কত উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
অন্যান্য অপসংস্কৃতির পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে আমাদের উচিত আমাদের মূল শেকড়ের দিকে মনোনিবেশ করা। কারণ, মুসলিম হিসেবে আমাদের রয়েছে নিজস্ব বর্ষবরণের এক গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
হিজরী সনের সংক্ষিপ্ত পটভূমি ও বৈশিষ্ট্য :
আরবি হিসাব অনুযায়ী মহরম মাস হলো বছরের প্রথম মাস। এই মাসটিতে জাহেলী যুগেও যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। মহররম মাসের ১ তারিখ হিজরী নববর্ষ শুরু হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সনের গণনা শুরু করা হয়।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর শাসন আমলে সাহাবায়ে কিরামের যৌথ পরামর্শে এই হিজরতের বছরটিকে (৬২২ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম বছর ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে 'হিজরি সন' প্রবর্তন করা হয়।
হিজরি সন এবং পশ্চিমাদের প্রচলিত ইংরেজি (গ্রেগরিয়ান) ক্যালেন্ডারের গণনা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রচলিত ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যেমন সূর্যের গতিপথ বা সূর্যের আলোকে হিসাব করা হয়, কিন্তু হিজরি সন সেই পদ্ধতিতে গণনা করা হয় না, এটি সম্পূর্ণভাবে চাঁদের গতি ও প্রতি মাসে নতুন চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভর করে বলেই হিজরি সনে প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনে হয় এবং বছরটি সূর্যের হিসাব থেকে প্রায় ১১ দিন ছোট হয়।
যে কারণে হিজরি নববর্ষই সেরা :
বর্তমানে প্রচলিত ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যে বর্ষপূর্তি উদযাপিত হয়, তা থার্টি ফার্স্ট নাইট নামে পরিচিত। এই দিনটি সাধারণত উদযাপন করা হয় আতশবাজি, হই-হুল্লোড়, গান- বাজনার মতো বিভিন্ন হারাম ও ক্ষতিকর কাজের মাধ্যমে। এই দিনে যদি কেউ সুন্দরভাবে তার নতুন বছর আরম্ভ করতে চায়, তাহলে তার আশেপাশের পরিবেশের কারণে তা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে।
অপরদিকে, হিজরি নববর্ষের সূচনা হয় সম্পূর্ণ শান্ত, স্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে, যা আমাদের ইবাদত ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নতুন করে পথ চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। তাহলে মুসলমান হিসেবে আমাদের নিজস্ব এত গৌরবময় একটি হিজরি নববর্ষ ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, আমরা কেন অপসংস্কৃতির জোয়ারে ভেসে বিধর্মীদের তৈরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ উদযাপন করব?
তাছাড়াও অপসংস্কৃতির অনুসরণ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন - "যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।"
[সুনানে আবু দাউদ]
তিনি আরো ইরশাদ করেন :
"‘যে ব্যক্তি যে জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে, সে সেই জাতিরই অন্তর্ভুক্ত। "(মিশকাত শরিফ : ৪৩৪৭)
হিজড়ি নববর্ষ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে :
"নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও কিতাবে আল্লাহর গণনায় মাস বারোটি, যেদিন তিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।" (সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)
আমাদের রমজানের রোজা, দুই ঈদ, হজ, জাকাত আদায় এবং শবে বরাতসহ ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও আমল চান্দ্রমাস বা হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। চাঁদ দেখার মাধ্যমেই এসব ইবাদতের সময় নির্ধারণ করা হয়। তাই একজন মুসলমান হিসেবে হিজরি সনের হিসাব রাখা, এর মাসসমূহ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ইসলামী দিন-তারিখের গুরুত্ব অনুধাবন করা আমাদের দ্বীনি দায়িত্ব ও ইসলামী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই আমাদের উচিত অন্ধের মতো অপসংস্কৃতির অনুসরণ না করে নিজেদের মহিমান্বিত ইসলামী ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করা এবং অন্যদেরও একই কাজে উৎসাহিত করা।
আমাদের যেভাবে হিজরি নববর্ষ উদযাপন করা উচিত:
ইবাদত ও নফল রোজার মাধ্যমে:
বছরের প্রথম দিনটি ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে শুরু করা উচিত।যেহেতু মহররম মাসটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, তাই এই দিনে নফল রোজা রাখা, বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত,সাদকা, জিকির-আজকার ও দরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে নতুন বছরের সূচনা করাই হলো উত্তম কাজ।
আত্মসমালোচনা ও তওবা: জীবন থেকে একটা বছর কমে গেল—এই উপলব্ধি থেকে পেছনের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, আরও একটি নতুন বছর দেখার সুযোগ পাওয়ায় আল্লাহর নিকট অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করা এবং নতুন বছরে ভালো আমল করার প্রতিজ্ঞা করা।
সবাইকে উৎসাহিত করা: নিজে হিজরি নববর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, প্রতি ও আশেপাশের সবাইকে এই পবিত্র দিনটি পালনে উৎসাহিত করা।
পরিশেষে,আমাদের পরিচয় আমাদের ঐতিহ্যে। আমরা যদি নিজের শেকড়কে সম্মান না করি, তবে অন্য কেউ তা করবে না। আসুন, হিজরি নববর্ষকে অপসংস্কৃতির বিপরীতে একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লব হিসেবে গ্রহণ করি এবং নিজেদের জীবনকে ইসলামিক আদর্শের রঙে রাঙিয়ে তুলি।বি-হুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
লেখিকা-শিক্ষার্থীঃ- জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম।