
প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা ও জন আকাঙ্ক্ষার ব্যবধান
নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
আর এই নির্বাচনের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতিহার। ইশতিহার মূলত জনগণের কাছে একটি লিখিত অঙ্গীকার, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা, উন্নয়ন লক্ষ্য ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হয়ে সরকার গঠনের পর প্রশ্ন জাগে—এই ইশতিহার কতটুকু বাস্তবে রূপ নেয়।
ইশতিহার কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক দলের ইশতিহার ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে।
একজন ভোটার আশা করেন, যাকে ভোট দেবেন তিনি বা তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবেন।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো প্রায় সব ইশতিহারের সাধারণ অংশ। তাই ইশতিহার জনগণের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হয়।
বাস্তবায়নের চিত্র ও সীমাবদ্ধতা
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ইশতিহারের সব প্রতিশ্রুতি এক মেয়াদে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন খুব কম ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়।
অনেক প্রতিশ্রুতি আংশিক বাস্তবায়িত হয়, কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তালিকায় থেকে যায়, আবার কিছু একেবারেই উপেক্ষিত হয়। বাজেট ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা, ধীরগতি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইশতিহার বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন
ইশতিহার বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকার যদি জনগণের কাছে সত্যিকার অর্থে জবাবদিহিমূলক হতে চায়, তবে তারা অন্তত ইশতিহারের প্রধান ও জরুরি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়।
কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর ইশতিহার আর বাধ্যতামূলক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় না।
সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা দুর্বল হলে এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের চাপ কম থাকলে এই প্রবণতা আরও বাড়ে।
জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংঘাত
ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তবতা বিবর্জিত প্রতিশ্রুতি দেয়।
এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল অর্থ, দীর্ঘ সময় ও কাঠামোগত সংস্কার। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনীহা বা অক্ষমতা প্রকাশ পায়। এর ফল হিসেবে জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয় এবং রাজনীতির প্রতি আস্থা কমে যায়।
ইতিবাচক দিকও আছে
সবকিছুর পরও ইশতিহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা চালু, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা দারিদ্র্য বিমোচনে অনেক সরকার ইশতিহারের আলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ইশতিহার বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।
করণীয় ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
নির্বাচনী ইশতিহারকে কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথমত, ইশতিহার হতে হবে বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক।
দ্বিতীয়ত, সরকারকে নিয়মিতভাবে ইশতিহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
তৃতীয়ত, সংসদীয় নজরদারি, শক্তিশালী বিরোধী দল এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জবাব চাইতে হবে।
নির্বাচনী ইশতিহার কেবল ভোটের কৌশল হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর যদি তা বাস্তবায়নের দায়বদ্ধ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে সেটিই হতে পারে টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের ভিত্তি।
ইশতিহার কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে রাজনৈতিক দল ও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জামায়েত সহ অন্য দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতিহার প্রকাশ করছেন এ ইশতিহার বাস্তবায়নে সরকার গঠন হবার পর কতটুকু আন্তরিক তা বুঝবে জনগন।
লেখক :
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
যুগ্ম সদস্য সচিব: পটিয়া সচেতন নাগরিক ফোরাম।
Leave a Reply