1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
সম্প্রীতির অনন্য প্রতীক: পহেলা বৈশাখ -লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া চন্দনাইশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রথমবারের মতো সম্মিলিত বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা ১৪৩৩ বঙ্গোপসাগরে ফিশিং ট্রলার থেকে ১৫ কোটি টাকার ৫ লাখ ইয়াবা জব্দ, গ্রেফতার- ৯ চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় জাতীয় বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড মেলায় ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম হজ্ব -প্রফেসর ড. গিয়াস উদ্দিন তালুকদার বোয়ালখালীতে অবৈধভাবে মাটি কাটার দায়ে মোবাইল কোর্ট অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বোয়ালখালীতে ধর্মীয় বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, বৃত্তি প্রদান ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান চট্টগ্রামে পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রতি কক্ষে সিসিটিভি স্থাপনের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর যুদ্ধবিরতি করে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ এড়ালেন বটে, তবে দিতে হচ্ছে চড়া মূল্য নানিয়ারচর সেনা জোন কর্তৃক বগাছড়িতে ফুটবল টুর্নামেন্টে পুরস্কার ও আর্থিক অনুদান

সম্প্রীতির অনন্য প্রতীক: পহেলা বৈশাখ -লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া

  • সময় শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৭ পঠিত

বাংলা নববর্ষ: পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনচক্রে এক নব প্রভাতের নাম। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদলের দিন নয়; বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও চেতনার গভীরে প্রোথিত ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। বছরের এই প্রথম দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় যেমন পরিবর্তিত হয়, তেমনি উৎসবও তার সঙ্গে নতুন রূপে বিকশিত হয়।

পহেলা বৈশাখের আদিকালের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে কৃষিনির্ভর বাংলার জীবনব্যবস্থায়। প্রাচীন বাংলায় ঋতুচক্র ও কৃষিকাজের সঙ্গে মানুষের জীবন ছিল নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বৈশাখ মাসের আগমন মানেই ছিল নতুন ফসল তোলার পর এক নতুন অর্থবছরের সূচনা। কৃষকরা পুরনো দেনা-পাওনার হিসাব মিটিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার মানসিক প্রস্তুতি নিতেন। গ্রামীণ সমাজে এই সময়টিকে ঘিরে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ-উৎসবের আবহ তৈরি হতো; যেখানে লোকগীতি, পালাগান, যাত্রা, এবং গ্রামীণ মেলার মাধ্যমে মানুষ সামষ্টিক আনন্দে মেতে উঠত।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলা সনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। হিজরি চান্দ্র সনের সঙ্গে কৃষিনির্ভর ফসলি মৌসুমের অমিল দূর করতে তিনি একটি সৌরভিত্তিক সন প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন, যা ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীতে ‘বাংলা সন’-এ রূপান্তরিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আদায়কে সহজ ও সময়োপযোগী করা, যাতে কৃষকেরা ফসল ঘরে তোলার পর কর পরিশোধ করতে পারেন। এই প্রশাসনিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

সেই সময় থেকেই ‘হালখাতা’ প্রথার সূচনা ঘটে। ব্যবসায়ীরা বছরের প্রথম দিনে পুরনো হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন করতেন। দোকানগুলোতে থাকত মিষ্টিমুখের আয়োজন, আমন্ত্রণ ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ। এভাবে পহেলা বৈশাখ কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সূচনা নয়, সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠনেরও একটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

গ্রামীণ বাংলায় বৈশাখী মেলা ছিল এই উৎসবের প্রাণ। বিভিন্ন স্থানে বসত এসব মেলা, যেখানে হস্তশিল্প, মাটির পাত্র, নকশিকাঁথা, খেলনা, এবং নানা লোকজ সামগ্রীর সমাহার ঘটত। লোকসংগীত, বাউল গান, জারি-সারি, গম্ভীরা কিংবা পালাগানের আসর জমে উঠত। এসব আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, বরং লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। মানুষ এখানে মিলিত হতো, আনন্দ ভাগাভাগি করত এবং এক ধরনের সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করত।

সময়ের প্রবাহে, বিশেষত ঔপনিবেশিক আমল এবং পরবর্তী আধুনিক যুগে, পহেলা বৈশাখের রূপে আসে পরিবর্তন। শহরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশ, শিক্ষার প্রসার এবং গণমাধ্যমের প্রভাব এই উৎসবকে আরও ব্যাপকতা দেয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ একটি অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে।

বর্তমান সময়ে পহেলা বৈশাখ শহর ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই এক বর্ণাঢ্য উৎসব হিসেবে পালিত হয়। লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত মানুষ, রবীন্দ্রসংগীতের আবহ, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য এই দিনটিকে বিশেষ করে তোলে। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলালেও উৎসবের মূল চেতনা, অর্থাৎ নতুন সূচনা, ঐক্য ও সম্প্রীতি আজও অপরিবর্তিত রয়েছে।

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে, যা আমাদের সমাজে সহাবস্থান ও সহনশীলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করে। বর্তমান বিশ্বে যখন বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন এই উৎসব আমাদের ঐক্যের শক্তিকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সবশেষে বলা যায়, পহেলা বৈশাখের আদিকালের সরল গ্রামীণ উৎসব থেকে বর্তমানের জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিসরে বিস্তৃত উদযাপন; এই দীর্ঘ বিবর্তন বাঙালির জীবনধারা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তবুও এই পরিবর্তনের ভেতরেই অটুট রয়েছে আমাদের শিকড়, আমাদের ঐতিহ্য এবং আমাদের সম্মিলিত মানবিকতা।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।

লেখকঃ কলামিস্ট ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট