
মানুষের পৃথিবী কি কেবল চোখে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? যে মানুষ চোখে দেখতে পান না, তাঁর কি স্বপ্ন, সম্ভাবনা কিংবা নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার নেই? নিশ্চয়ই আছে। কারণ মানুষের সামর্থ্য শুধু দৃষ্টিশক্তির ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে মেধা, দক্ষতা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের ওপর। অথচ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সামনে অনেক সময় সবচেয়ে বড় বাধা তাঁদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং সমাজের অবহেলা, অসচেতনতা ও সুযোগের অসমতা। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত বিশ্ব সাদা ছড়ি দিবস আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
সাদা ছড়ি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপকরণ। এটি শুধু পথের প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে না, বরং স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ১৫ অক্টোবরকে ‘হোয়াইট কেইন সেফটি ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পরবর্তী সময়ে দিনটি বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ পথচলায় ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত সড়ক, খোলা ম্যানহোল, অসমতল পথ এবং যানবাহনের অসচেতনতা বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা গ্রহণেও তাঁদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। অথচ উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সহায়ক প্রযুক্তির সুযোগ পেলে তাঁরাও শিক্ষক, লেখক, আইনজীবী, উদ্যোক্তা কিংবা বিভিন্ন পেশায় দক্ষতার সঙ্গে অবদান রাখতে পারেন। তাই করুণার পরিবর্তে তাঁদের যোগ্যতা, সামর্থ্য ও সমান অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রণীত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, বাধামুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, প্রবেশগম্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠন লায়ন্স ইন্টারন্যাশনালের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব সাদা ছড়ি দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশ চট্টগ্রামে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে। এবারের কর্মসূচিতে জিইসি মোড় থেকে চিটাগাং লায়ন্স ফাউন্ডেশন পর্যন্ত র্যালি, হালিমা রোকেয়া মেমোরিয়াল হলে আলোচনা সভা এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে সাদা ছড়ি বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। এ উদ্যোগ নিরাপদ চলাচল ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সাদা ছড়ি ব্যবহারকারী কাউকে সহযোগিতা করার আগে তাঁর অনুমতি নিতে হবে। ফুটপাত দখল না করা, চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি না করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া আমাদের নাগরিক কর্তব্য।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হবেন না। বিশ্ব সাদা ছড়ি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, করুণা নয় সম্মান, অবহেলা নয় সমান অধিকার, আর বাধা নয় স্বাধীন পথচলার সুযোগ। কারণ চোখে দেখতে না পারা মানেই স্বপ্ন দেখতে না পারা নয়।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।
Leave a Reply