
মোঃ কায়সার চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের এ প্রক্রিয়াকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও আইনি জটিলতা। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)–এর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই স্থানীয় অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর এতদিন ‘টুল পোর্ট’ মডেলে পরিচালিত হয়ে এলেও এখন ধীরে ধীরে ‘ল্যান্ডলর্ড’ মডেলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ মডেলে বন্দরের জমি সরকারের মালিকানায় থাকলেও টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বেসরকারি কিংবা বিদেশি অপারেটরদের হাতে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব নিয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, সিঙ্গাপুরের পিএসএ এবং নেদারল্যান্ডসের এপিএম টার্মিনালস এনসিটি ও বে-টার্মিনাল পরিচালনায় বিনিয়োগ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে শ্রমিক সংগঠন ও দেশীয় পেশাজীবীদের আপত্তি হলো—লয়েডস লিস্টে বর্তমানে ৬৭তম অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো গড়ে উঠেছে নিজস্ব অর্থায়নে। সেক্ষেত্রে লাভজনক টার্মিনালগুলো বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া যৌক্তিক নয়।
আইনি জটিলতায় অপারেটর নিয়োগ স্থগিত
বিদ্যমান বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের পাশাপাশি নতুন অপারেটর নিয়োগে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। ‘শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী এ প্রক্রিয়া শুরু হলেও বার্থ হ্যান্ডলিং অপারেটর এম এইচ চৌধুরী লিমিটেডের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত তিন মাসের জন্য নতুন অপারেটর নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করেন। ফলে বন্দরের অপারেশনাল খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ আপাতত থমকে গেছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘লাইসেন্সের বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। আদালতের স্টে অর্ডার থাকায় এ নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে বন্দরের অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিরোধিতা
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরে প্রায় ১৩ কোটি টন পণ্য ও ৩৩ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আরও দক্ষ ও আধুনিক অপারেটর প্রয়োজন। সদ্যসমাপ্ত বছরে চট্টগ্রাম বন্দর সর্বোচ্চ ৩৪ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড গড়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা স্বয়ংসম্পূর্ণ এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দিলে বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেউ কেউ এটিকে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বলেও দাবি করছেন। তবে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য, বিদেশি অপারেটর কেবল পরিচালনার দায়িত্ব পাবে, ট্যারিফ ও মাশুল নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতেই থাকবে।
অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগই হতে পারে উত্তম সমাধান। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর নিয়ে হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায় সত্ত্বেও সরকার চুক্তি আলোচনার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চুক্তির খসড়া নিয়ে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্তভাবে বিচারাধীন।
Leave a Reply