
বাংলাদেশের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও নীরবে সমাজকে বদলে দিয়েছেন। হযরত আবু মোহাম্মদ মোস্তাক বিল্লাহ সুলতানপুরী (রঃ) ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব—সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
১৯৪৯ সালের ১ জুন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও এলাকায় জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন একজন বিএসসি ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষ। তাঁর পিতা শাহসূফি হযরত আবুল খায়ের সুলতানপুরী (রহ.)–এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি মানবসেবা ও নৈতিক সমাজ গঠনের ব্রত গ্রহণ করেন। সাতগাছিয়া দরবার শরিফের সাজ্জাদানশীন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ধর্মকে কেবল আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সমাজকল্যাণের বাস্তব কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর দেশপ্রেমের প্রমাণ বহন করে। স্বাধীনতার পর তিনি অস্ত্র নামিয়ে নেন, কিন্তু সমাজগঠনের সংগ্রাম থেকে সরে যাননি। শিক্ষা বিস্তার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, যৌতুকবিরোধী আন্দোলন ও মাদক প্রতিরোধে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা দক্ষিণ চট্টগ্রামের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—নৈতিকতা ও জ্ঞানচর্চা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, ছাত্র-ছাত্রীদের বই পড়ায় উৎসাহিত করা এবং তরুণদের উচ্চশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার কাজকে অগ্রাধিকার দেন। বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাঁর কর্মপরিকল্পনায় ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক চেতনার এক সমন্বিত রূপ দেখা যায়।
পরিবেশ ও অর্থনীতির প্রশ্নেও তিনি ছিলেন সচেতন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করা, উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালনা—এসব উদ্যোগ ছিল তাঁর দূরদর্শিতার পরিচায়ক। একই সঙ্গে হালাল ও কল্যাণমুখী ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি অর্থনৈতিক নৈতিকতার বার্তা দিয়েছেন।
আজ যখন সমাজ নানা বিভাজন, কুসংস্কার ও মূল্যবোধের সংকটে আক্রান্ত, তখন তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আলোকিত সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, জ্ঞানচর্চা ও মানবিক দায়বদ্ধতা। ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর তাঁর ইন্তেকালে এক আলোকবর্তিকার প্রস্থান ঘটেছে; কিন্তু তাঁর আদর্শ ও কর্মধারা রয়ে গেছে পথনির্দেশক হয়ে।
সমাজ যদি সত্যিই টেকসই উন্নয়ন ও নৈতিক পুনর্জাগরণ চায়, তবে হযরত মোস্তাক বিল্লাহ সুলতানপুরী (রঃ)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ব্যাংকার,লেখক ও কলামিস্ট
Leave a Reply