
সৈয়দ মিয়া হাসান
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে উন্নত বীজ, সার, সেচ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা কঠিন। তাই কৃষি খাতে সহজ অর্থায়ন শুধু ঋণ বিতরণের বিষয় নয়; এটি উৎপাদনক্ষমতা, কৃষকের মুনাফা এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ সংশোধিত নীতিমালায় বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংককে ৩ শতাংশ হারে পুনঃঅর্থায়ন এবং কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফার সীমা নির্ধারণ করেছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ফসল উৎপাদনে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ ফসলের ওপর হাইপোথেকেশনের বিপরীতে জামানত ছাড়াই দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সুদহার অনেক ক্ষেত্রে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে—আপনার উল্লিখিত হারটি একটি তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, তবে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি অভিন্ন নয়। অন্যদিকে ব্যাংকের কৃষিঋণ অনেক ক্ষেত্রে ১২–১৪ শতাংশ বা তার কাছাকাছি হতে পারে, আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে আরও কম হারে অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রান্তিক কৃষকের জন্য সঠিক স্কিমে ঋণ পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।
কৃষকের অর্থায়নকে শুধু মৌসুমি ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। গরু ও ছাগলের খামার, দুগ্ধ উৎপাদন, মৎস্য, হাঁস-মুরগি এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করতে হবে। গরু ও ছাগল পালনকারীদের মাসিক কিস্তির পরিবর্তে বার্ষিক বা উৎপাদনচক্রভিত্তিক পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলে তারা পশু বিক্রির উপযুক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবেন। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএসসিসহ কিছু ব্যাংকে এই ধরনের বিনিয়োগের ব্যবস্থা আছে। অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে এ ধরনের কৃষিভিত্তিক অর্থায়ন আরও সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
তবে শুধু ঋণ দিলেই হবে না। প্রান্তিক কৃষককে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, হিসাবরক্ষণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষিত বেকার তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ আসবে। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক কৃষি খামার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ফসল, ফল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষিযন্ত্র, সেচ সরঞ্জাম ও গ্রামীণ আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালের আগের একটি ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ২ লাখ ৮২ হাজার ৯৯২ জন উপকারভোগীর মধ্যে ৪ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা বিতরণের তথ্যও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে রয়েছে।
এখন প্রয়োজন ব্যাংকঋণের আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা। নতুন উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে তিন বছরের ট্রেড লাইসেন্স ও দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার শর্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত। নতুন উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, সম্ভাব্য আয় ও জামানতের বিকল্প বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার।
সবশেষে বলা যায়, কৃষি খাতে সস্তা ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ ও কার্যকর তদারকির সমন্বয় ঘটাতে পারলে কৃষকের উৎপাদন ও মুনাফা বাড়বে, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং খাদ্য আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। কৃষকের হাতে সহজ অর্থায়ন পৌঁছানো মানে শুধু একটি খামারকে সহায়তা করা নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সক্ষমতায় বিনিয়োগ।
ব্যাংকার, লেখক ও কলামিস্ট
Leave a Reply