
বাংলাদেশ প্রকৃতিগতভাবে নদী, খাল ও জলাভূমির দেশ। একসময় দেশের গ্রামাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল অসংখ্য খাল, যা কৃষি উৎপাদন, সেচব্যবস্থা, নৌযাতায়াত এবং পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে এসব খালের অনেকগুলোই আজ হারিয়ে গেছে অথবা কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, কৃষিতে সেচ সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় খাল পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি আজ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। অনেকেই এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মৃতি হিসেবে দেখছেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর সময়কার খাল খনন কর্মসূচি।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলে খাল খনন ও খাল সংস্কারের মাধ্যমে দেশের বহু এলাকায় কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থা সহজ হয় এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি হয়। এর ফলে অনেক অঞ্চলে জলাবদ্ধতা কমে এবং কৃষকদের উৎপাদন বাড়ে। পাশাপাশি গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, কারণ অনেক খাল তখন নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিবৃষ্টি এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শহর ও শহরতলীর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও পানি জমে থাকা এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে খাল পুনঃখনন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং পরিবেশ রক্ষা, কৃষি উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এই উদ্যোগকে অনেকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের বাস্তব ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। কারণ অতীতে খাল খনন কর্মসূচি যেমন গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিল, তেমনি বর্তমানেও তা কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে খাল পুনঃখনন ও সংরক্ষণ করা গেলে এর বহুমুখী সুফল পাওয়া সম্ভব। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে, বর্ষাকালে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে এবং জলাবদ্ধতা কমবে। একই সঙ্গে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। এছাড়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে অনেক এলাকায় নৌপথ ব্যবস্থাও আংশিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
তবে খাল খনন কর্মসূচি সফল করতে হলে শুধু খনন করলেই চলবে না; খাল দখলমুক্ত করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করাও অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় কয়েক বছরের মধ্যেই খালগুলো আবার ভরাট বা দখলের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে খাল খনন একটি পরীক্ষিত কর্মসূচি। অতীতে যেমন এই উদ্যোগ কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিল, তেমনি বর্তমান সময়েও এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিকল্পিতভাবে খাল পুনঃখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে তা হবে পরিবেশ, কৃষি এবং অর্থনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শন এবং বর্তমান সরকারের উদ্যোগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হলে নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং জলসম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা অপরিহার্য।
লেখক পরিচিতি : কলাম লেখক ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।
Leave a Reply