“মানুষ ভুল করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুল মানুষ কে নয়, ভুল কাজটিকেই ঘৃণা করার শিক্ষা দেয় ধর্ম, সমাজ ও মানবতা। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে ভুল করি, পাপে জড়াই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে একজন মানুষকে সারাজীবন শুধু তার ভুল দিয়েই বিচার করতে হবে। পাপ হলো একটি অন্যায় কাজ, যা সমাজ ও ধর্ম উভয়ের কাছেই নিন্দিত। কিন্তু পাপী হলো সেই মানুষটি, যে অজ্ঞতা, লোভ, রাগ কিংবা প্রলোভনের কারণে সেই অন্যায় কাজ করেছে। মানবজীবন মূলত ভুল ও সংশোধনের মেলবন্ধন। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে জীবনে কখনো পাপে জড়ায়নি বা কোনো ভুল করেনি। তবে মানুষের মহত্ব তার ভুলকে আঁকড়ে ধরে রাখা নয়, বরং ভুল বুঝে তা থেকে ফিরে আসায়। এ কারণেই সমাজ, ধর্ম ও মানবতার শিক্ষা হলো—পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করতে হবে।
পাপ এক ভয়ংকর অশুভ শক্তি। এটি মানুষের অন্তরের আলো নিভিয়ে দেয়, হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে। পাপের কারণেই সমাজে অসত্য, অন্যায়, দুর্নীতি, লালসা ও বৈষম্য জন্ম নেয়। পাপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানেই ন্যায়, সত্য ও মানবতার পক্ষে অবস্থান। কিন্তু পাপী আসলে একজন মানুষ—যে দুর্বলতা, অজ্ঞতা, প্রলোভন কিংবা পরিস্থিতির শিকার হয়ে ভুলের পথে গেছে। একজন মানুষ যদি পাপে লিপ্ত হয়, তবে তার কাজকে ঘৃণা করা ন্যায়সংগত, কিন্তু পাপীকে ঘৃণা করা নয়।
আমরা যদি পাপীকে ঘৃণা করি তবে মানুষটি সংশোধনের সুযোগ হারাবে। সে আরও ক্ষোভ, হতাশা ও ঘৃণায় অন্ধ হয়ে গভীর অপরাধের পথে চলে যেতে পারে। কিন্তু যদি আমরা পাপকে ঘৃণা করি এবং পাপীকে সংশোধনের সুযোগ দিই, তবে সে একসময় আলোর পথে ফিরে আসার সুযোগ হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অনেক বড় বড় অপরাধীও অনুতাপ ও তওবা করে একসময় মহৎ মানুষ হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছেন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট। যেমন : ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু—সব ধর্মেই মানুষকে ঘৃণা না করে তার দোষ-ত্রুটি সংশোধনের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম বলেছে, আল্লাহ তওবা গ্রহণকারীকে ভালোবাসেন। বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা দেয়- মানুষকে দয়া করতে, কারণ করুণা মানুষকে পরিবর্তনের পথ দেখায়। খ্রিষ্টধর্মের বাণীও বলে—পাপ ঘৃণা করো, কিন্তু পাপীকে ভালোবাসো।
সমাজে যদি আমরা প্রতিটি মানুষকে তার পাপ দিয়েই বিচার করি তবে কোনো অপরাধী সংশোধিত হওয়ার সুযোগ পাবে না। একজন মাদকাসক্তকে ঘৃণা করলে সে সমাজচ্যুত হয়ে আরও ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু মাদকের অভ্যাসকে ঘৃণা করে মানুষটিকে চিকিৎসা, পরামর্শ ও সহমর্মিতা দিলে সে হয়তো সুস্থ জীবনে ফিরবে। একইভাবে, একজন চোরকে ঘৃণা করলে সে আরও বড় অপরাধী হবে, কিন্তু চুরিকে ঘৃণা করে সততার শিক্ষা দিলে সে সমাজের জন্য উপকারী মানুষে পরিণত হতে পারে।
আজকের সমাজে অপরাধ, দুর্নীতি ও অন্যায় বাড়ছে। এ অবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হলো—অপরাধকে ঘৃণা করা, অপরাধীকে নয়। আইন তার বিচার করবে, কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাকে ফেরার সুযোগ দেবে। এতে করে একজন মানুষ বাঁচবে, একটি পরিবার বাঁচবে, আর সমাজও পাবে আলোর দিশা।
সুতরাং আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত—“পাপের বিরুদ্ধে আপসহীন, কিন্তু পাপীর প্রতি দয়ালু।” কারণ মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই মানুষই আবার ভালো হতে পারে। মানবিক সমাজ গড়তে হলে ঘৃণার লক্ষ্য হতে হবে পাপ, মানুষ নয়। এভাবে যদি আমাদের সমাজ পরিচালিত হয় তবে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে বিভিন্ন পাপাচার কমে আসবে এবং আদর্শ সমাজ বা রাষ্ট্র গঠিত হবে।
Leave a Reply