বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পরিসরে অসাধারণ নেতৃত্ব, সংগঠক সুলভ গুণাবলি ও সমাজসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তেমনই এক বিরল কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন চট্টগ্রামের পাঠানটুলীর কৃতীসন্তান মুহাম্মদ আশরাফ খান। রাজনীতি, সমাজসেবা, প্রাবন্ধিক লেখক, আলোকিত বক্তা, ছাত্র গনআন্দোলন ও পরিবহন খাতে তাঁর অনবদ্য অবদান তাঁকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি ইতিহাসের প্রয়োজনে স্মরণীয় ও বরণীয় মানুষ।
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পাঠানটুলীতে খান বংশে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ আশরাফ খান ঐতিহাসিক পাঠান বংশের উত্তরসূরি। উল্লেখ্য, এই পাঠান বংশ থেকেই পাঠানটুলী নামের উৎপত্তি। তাঁর পিতা মরহুম আমানত খান (বি.এল) একজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও শিক্ষানুরাগী নেতা ছিলেন। আমানত খান ১৯১৪ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এ এবং পরবর্তীতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি পাঠানটুলীতে একাধিক শিক্ষা ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং ১৯২৪-১৯২৮ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। পিতার অনুসারী হয়ে মুহাম্মদ আশরাফ খান জগত বিখ্যাত হয়ে উঠেন।
প্রারম্ভিক শিক্ষা জীবন ও ছাত্র রাজনীতি: মুহাম্মদ আশরাফ খানের নেতৃত্বের বীজ রোপিত হয় ছাত্রজীবনেই। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি স্কাউট লিডার ও ছাত্র সংসদের জেনারেল ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাহেবের চট্টগ্রামে আগমন উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের সংগঠক হিসেবে ভাষণ দিয়ে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। তিনি শিক্ষা সপ্তাহে বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার অর্জন করেন, এবং চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও সিটি কলেজে ছাত্র সংসদের সহ-সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
রাজনীতিতে সক্রিয়তা ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা:- ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আশরাফ খান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। চট্টগ্রাম শহরে বেবী টেক্সি ও রিকশা শ্রমিকদের সংগঠিত করে তিনি শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ান।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে অভিযুক্ত করার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে মুহাম্মদ আশরাফ চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা মাইকযোগে প্রচার করেন, যা তাঁর দেশপ্রেম ও সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজ গঠনে অবদান:- স্বাধীনতার পর মুহাম্মদ আশরাফ খান চট্টগ্রাম বহুমুখী সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করে অসহায় টেক্সি ও রিকশাচালকদের কিস্তিতে টেক্সি ও রিকশা প্রদান করেন।
১৯৭৩ ও ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর জনপ্রিয়তা ও সক্রিয়তা প্রমাণ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৯ সালে ঢাকা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালুর সময় সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে কলকাতা সফর করেন। তিনি দীর্ঘদিন এফবিসিসিআই-এর পরিবহণ সংক্রান্ত উপ-কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও সাংস্কৃতিক প্রজ্ঞা:- মুহাম্মদ আশরাফ খান শুধুই একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল সমাজ সংস্কারক। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একটি কৃষি খামার ও ফলের বাগান স্থাপন করেন, যা তাঁর কর্মমুখর জীবনের বহুমাত্রিকতার প্রমাণ। মুহাম্মদ আশরাফ খান চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি এর পরে উপদেষ্টা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভারত নেপাল ইতিহাস মঞ্চের সভাপতি, সার্ক কাসারাল ফোরাম বাংলাদেশের সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলমান ইতিহাস সমিতির সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি আলোকিত বক্তা ছিলেন। ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে ব্যাপক ভুমিকা রেখেছেন। তিনি বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমন করেছেন। তিনি চট্টগ্রাম ইতিহাস উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান ও সোহেল ফখরুদ-দীন মহাসচিব হিসেবে ১০ বার চট্টগ্রাম উৎসব পালন করেছেন। পারিবারিক জীবনে তাঁর স্ত্রী মিসেস ফাতেমা মেহরুন নিসা ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কমিশনার। তাঁদের সন্তানরাও শিক্ষিত ও সমাজসচেতন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁরাও পিতার মতো ভুমিকা রাখছেন দেশের কল্যানে।
মুহাম্মদ আশরাফ খান ছিলেন একাধারে রাজনীতিক, সংগঠক, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী। তাঁর জীবন ও কর্ম চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। পাঠানটুলীর ঐতিহ্যবাহী মাটি থেকে উঠে এসে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েছেন। ৩ জুন ২০১৮ সালে তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারায় এক পরীক্ষিত সমাজ সংগঠককে। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, মুহাম্মদ আশরাফ খান ছিলেন একজন প্রকৃত ‘জনতার নেতা’, যাঁর আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক এবং প্রেরণাদায়ক।
লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (সিএইচআরসি), সভাপতি, মুসলিম হিস্ট্রি এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ।
Leave a Reply