
সম্পাদকীয়ঃ
মদীনা মুনাওয়ারার স্নিগ্ধ বাতাসে যেন হৃদয়ের সব গ্লানি ধুয়ে মুছে যায়। মসজিদে নববীর সুদৃশ্য মিনার আর সবুজ গম্বুজের ছায়াতলে পৌঁছানো মানেই পার্থিব ব্যস্ততা ও কোলাহলের ঊর্ধ্বে এক আলৌকিক শান্তি লাভ করা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারকের সন্নিকটে—বিশেষ করে রিয়াজুল জান্নাহ ও রওজা মোবারক সংলগ্ন পবিত্র প্রাঙ্গণে—দাঁড়ানোর অনুভূতি প্রতিটি মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরম প্রাপ্তি ও আজীবন লালিত স্বপ্ন। এই ছবিটি আমার সর্বশেষ রওজা শরীফ জেয়ারতের স্মৃতি
সকাল বেলা যখন হেরেম শরীফে প্রবেশ করি তখন ফজরের আজান হচ্ছিল। কি এক প্রশান্তি। যখন রওজার প্রবেশপথ দিয়ে বের হচ্ছিলাম তখন সূর্য অনেক উপরে উঠে গেছে। এদিকে দু’চোখ একটু জ্বলছিলো। প্রবেশপথ নিয়ে আজকের কলম ধরলাম।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারক ও মসজিদে নববীর সীমানায় বেশ কিছু ঐতিহাসিক দরজা রয়েছে, যার প্রতিটির রয়েছে নিজস্ব তাৎপর্য ও ঐতিহ্য:
বাবুস সালাম (السلام باب – শান্তির দরজা): এটি রওজা মোবারকে প্রবেশের এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে সালাম পেশ করার প্রধান ও সবচেয়ে ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার। এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় ভক্তদের হৃদয় ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অবনমিত হয়, আর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হয়— “আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ” (হে আল্লাহর রাসূল, আপনার ওপর শান্তি ও সালাত বর্ষিত হোক)।
বাবুজ জিবরীল (جبريل باب): রওজা মোবারকের পূর্ব দিকে অবস্থিত অত্যন্ত বরকতময় এই দরজা। ঐতিহ্য অনুযায়ী, হযরত জিবরীল (আ.) ওহী নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আসার সময় এই পথটি ব্যবহার করতেন।
বাবুন নিসা (نساء ال باب – নারীদের দরজা): ঐতিহাসিকভাবে নারী সাহাবি ও মুমিন নারীদের মসজিদে নববীতে প্রবেশ, সালাত আদায় এবং জিয়ারতের সুবিধার্থে এই দরজাটি নির্ধারিত ছিল।
বাবুল বাকী (البقيع باب): রওজা মোবারকে সালাম ও ইবাদত নিবেদনের পর যিয়ারতকারীরা সাধারণত এই দরজা দিয়ে বের হয়ে জান্নাতুল বাকী গোরস্থানের দিকে গমনাগমন করেন, যেখানে শুয়ে আছেন রাসূল (সা.)-এর বহু প্রিয় সাহাবি ও আহলে বাইতের সদস্যরা।
রিয়াজুল জান্নাহর মধ্যে নামাজ আদায়:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা শরীফ ও তাঁর পবিত্র মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটি হলো ‘রিয়াজুল জান্নাহ’ বা আক্ষরিক অর্থে ‘জান্নাতের বাগান’। এই বিশেষ স্থানটির ফজিলত সম্পর্কে প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন— “আমার ঘর ও আমার মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।”
এই পবিত্র স্থানে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করা কিংবা এক মুহূর্ত বসে আল্লাহর জিকির করা মানে জান্নাতের সুবাস অনুভব করা। সেখানে পৌঁছা মাত্রই এক অভাবনীয় প্রশান্তি পুরো অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমরা সহজে সেই স্থানটিতে নামাজ আদায় করতে পারতাম। আল্লাহ অনেকবার তৌফিক দিয়েছেন। এখন তা অনেক প্রক্রিয়ার মধ্যে করতে হয়।

সবুজ গম্বুজের সাথে স্মৃতির স্বাক্ষী রাখলাম একটি ছবির মাধ্যম।
রওজা মোবারকের চারপাশের সোনালী ও সবুজ জালিঘেরা পবিত্র প্রাঙ্গণের পেছনে লুকিয়ে আছে ইসলামের সোনালী ইতিহাস। যে ধুলোবালিভরা মাটিতে একসময় হেঁটেছেন মানবতার মহান শিক্ষক বিশ্বনবী (সা.) এবং তাঁর নিবেদিতপ্রাণ সাহাবিগণ, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে লাখো মুমিন অশ্রুসিক্ত নয়নে বিশ্বশান্তি, উম্মাহর কল্যাণ এবং নিজেদের গুনাহ মাফের আকুতি জানান।
রওজা মোবারকের কাছাকাছি এই দরজায় দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলা এবং নীরব প্রার্থনায় হৃদয়ের সমস্ত আকুতি নিবেদন করা ছাড়া আর কোনো ভাষার প্রয়োজন হয় না। এই পবিত্র মাটির স্পর্শ আর রওজার সুবাস মুমিনের ঈমানকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে, আর জীবনের বাকি পথ রাসূলের সুন্নাহর মায়াবী আলোয় পরিচালিত করার এক অবিচল সংকল্প দান করে।
মদীনা শরীফের এই পবিত্র মায়ার টানে বারবার ছুটে যাওয়ার আকুলতা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ হৃদয়ে সুপ্ত থাকে। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বারবার এই পবিত্র দরবারে হাজিরা দেওয়ার, রিয়াজুল জান্নাহর অপার বরকত লাভের এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক
Leave a Reply